বান্দরবানে সেনাবাহিনীর মানবিক উদ্যোগ: ৮৪ বছরের বৃদ্ধকে চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় বসবাস করা সাধারণ মানুষের জীবন সব সময়ই অনেক কঠিন ও সংগ্রামের। বিশেষ করে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে যখন কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন যাতায়াত ব্যবস্থা ও অর্থের অভাবে তাদের সুচিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এমন অসহায় পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শুধু দেশের সীমানা বা শান্তি রক্ষা করাই নয়, মানবিক দায়িত্ব ও জনসেবার অংশ হিসেবে বান্দরবান রিজিয়নের উদ্যোগে এক অসুস্থ প্রবীণ রোগীকে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই রোগীর পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তাদের মাঝে পর্যাপ্ত খাদ্য সামগ্রীও বিতরণ করেছে সেনাবাহিনী।

গত শনিবার, ২৭ জুন সকালে বান্দরবানের একটি সেনাক্যাম্পে এই চমৎকার ও মানবিক কাজটি সম্পন্ন হয়। সেভেন ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের মেডিকেল অফিসার (এমও) ক্যাপ্টেন হাসান ইকরামের সরাসরি উপস্থিতিতে ৮৪ বছর বয়সী অসুস্থ বৃদ্ধ অন্তহা কারবারিকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। এই প্রবীণ মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে চোখের নানা জটিল সমস্যায় ভুগছিলেন। চোখের সমস্যার কারণে তিনি ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছিলেন না, যা তার দৈনন্দিন জীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছিল। চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তার গরিব পরিবারের জন্য কয়েক সপ্তাহের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীও উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

এই মানবিক কাজের পেছনের গল্পটি বেশ আবেগময়। জানা যায়, গত ২২ জুন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) এবং চট্টগ্রাম এরিয়ার কমান্ডার বান্দরবানের লংলাইপাড়া আর্মি ক্যাম্প পরিদর্শনে যান। সেখানে স্থানীয় সাধারণ মানুষের সাথে মতবিনিময় করার সময় রোয়াংছড়ি থানার তংক্ষং পাড়ার বাসিন্দা ৮৪ বছর বয়সী অন্তহা কারবারি তার চোখের চিকিৎসার জন্য জিওসির কাছে একটি আকুল আবেদন জানান। জিওসি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে এই অসহায় বৃদ্ধের কথা শোনেন। তিনি বৃদ্ধের বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

আমাদের দেশে, বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে চোখের মতো স্পর্শকাতর অঙ্গের চিকিৎসা করানো বেশ ব্যয়বহুল। একজন সাধারণ রোগীর চোখের ভালো চিকিৎসা বা অপারেশন করাতে অনেক সময় ২০০থেকে৩০০(ডলার) বা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। তংক্ষং পাড়ার মতো একটি দুর্গম গ্রাম থেকে বান্দরবান শহরে এসে এত টাকা খরচ করে চিকিৎসা নেওয়া অন্তহা কারবারির পরিবারের পক্ষে ১০০% অসম্ভব ছিল। জিওসি মহোদয়ের নির্দেশের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেভেন ফিল্ড অ্যাম্বুলেন্সের একটি বিশেষ দল ওই দুর্গম গ্রামে যায় এবং বৃদ্ধকে সযত্নে বান্দরবানের এমডিএস (মেডিকেল ডিসপেনসারি)-এ নিয়ে আসে। সেখানে কর্তব্যরত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তাকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখে প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ বিনামূল্যে প্রদান করেন।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এমন মানবিক ও জনবান্ধব কার্যক্রমে বান্দরবানের স্থানীয় সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তংক্ষং পাড়ার বাসিন্দারা জানান, পাহাড়ে যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে বা কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়, তখন সেনাবাহিনীই সবার আগে তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এর আগে করোনা মহামারির সময় বা পাহাড় ধসের সময়ও সেনাবাহিনী এই এলাকার সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে খাবার ও চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে। একজন সাধারণ বৃদ্ধের সামান্য আবেদনে এত বড় একজন সেনা কর্মকর্তার এমন দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেওয়াটা সত্যিই সমাজের জন্য একটি দারুণ দৃষ্টান্ত।

পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর এমন জনকল্যাণমূলক কাজগুলো খুব বড় ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এই যে একটি বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা পাহাড়ের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। অন্তহা কারবারি ও তার পরিবার সেনাবাহিনীর এই উপকারের জন্য তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তারা আশা করেন, ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাহাড়ের অসহায় ও সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে এভাবেই ছায়ার মতো পাশে থাকবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ