৩ দিন ধরে নিখোঁজ পুঠিয়ার গৃহবধূ অনিকা, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে উধাও

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় এক রহস্যজনক নিখোঁজের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। উপজেলার শিবপুর বাজার মাইপাড়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী গৃহবধূ অনিকা খাতুন গত শুক্রবার (২৬ জুন) দুপুর থেকে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়েছেন। ঘটনার আজ তিন দিন পার হয়ে গেলেও তার কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে। এই আকস্মিক নিখোঁজের ঘটনায় অনিকার স্বামী, বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ভয় কাজ করছে। তাকে কেউ অপহরণ করেছে নাকি তিনি স্বেচ্ছায় কারও সাথে পালিয়ে গেছেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়নি।

নিখোঁজ অনিকা খাতুন পুঠিয়া উপজেলার শিবপুর বাজার মাইপাড়া গ্রামের স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী আল তৌফিকের স্ত্রী। তার বাবার নাম বাচ্চু মিয়া এবং তাদের আদি বাড়ি রাজশাহী নগরীর মতিহার থানাধীন ২৯ নং ওয়ার্ডের ডাঁশমারী এলাকায়। পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় চার বছর আগে আল তৌফিকের সঙ্গে অনিকার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে তাদের দাম্পত্য জীবন বেশ স্বাভাবিকই ছিল। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির কারও সাথে তার কোনো বড় ধরনের ঝগড়া বা বিরোধের কথা কখনো শোনা যায়নি। তাই হঠাৎ করে তার এভাবে নিখোঁজ হওয়াটা সবার কাছেই এক বিশাল রহস্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঘটনার দিনের বিস্তারিত বিবরণ জানা যায়। তারা জানান, গত শুক্রবার দুপুর আনুমানিক ৩টার দিকে অনিকা বাড়ি থেকে বের হন। যাওয়ার সময় তার পরনে ছিল একটি কালো রঙের বোরকা এবং পায়ে ছিল সাদা জুতা। পিঠে একটি চকলেট রঙের ব্যাগ ঝুলানো ছিল। অনিকা একা বাড়ি থেকে বের হননি, তার সাথে রিতু নামের এক বান্ধবীও ছিলেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও অনিকা আর বাড়িতে ফিরে আসেননি। এরপর পরিবারের লোকজন তাকে ফোনে কল দিলে তার মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়। তখনই পরিবারের লোকজনের মনে সন্দেহ ও ভয় কাজ করতে শুরু করে।

অনিকার পরিবারের দেওয়া তথ্যমতে, তার সাথে থাকা রিতু নামের ওই বান্ধবীর বাড়ি রংপুর জেলায়। রিতু হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং তার স্বামী কর্মসূত্রে বিদেশে থাকেন। তবে রিতুর সাথে অনিকার কীভাবে পরিচয় হলো বা তাদের মধ্যে কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, সে সম্পর্কে অনিকার স্বামী বা পরিবারের কাছে খুব বেশি কোনো তথ্য নেই। ঘটনার পর সম্ভাব্য সব আত্মীয়স্বজনের বাড়ি এবং পরিচিত জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও অনিকা বা রিতুর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। এরপর কোনো উপায় না পেয়ে ওই দিন রাত ৮টার দিকে অনিকার স্বামী আল তৌফিক পুঠিয়া থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি বা জিডি (জিডি নং-১৪৮৮) করেন।

এই নিখোঁজ রহস্যের পেছনে একটি বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন বা চুরির সন্দেহ করা হচ্ছে। নিখোঁজ অনিকার বড় ভাই আজমত সংবাদমাধ্যমকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় অনিকার পিঠে যে চকলেট রঙের ব্যাগটি ছিল, সেই ব্যাগের ভেতর আনুমানিক আড়াই লাখ টাকার দামি স্বর্ণালংকার এবং নগদ ১০ হাজার টাকা রাখা ছিল। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী আড়াই লাখ টাকার স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় ২ ভরি বা তার কিছুটা বেশি হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রায় প্রায় ২,১০০$ (ডলার) এর সমান। ভাই আজমতের দৃঢ় দাবি, রিতু নামের ওই নারী হয়তো কোনো প্রলোভন দেখিয়ে বা কৌশলে অনিকাকে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকাসহ তার সাথে নিয়ে গেছেন।

আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জে এমন নিখোঁজের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, পরিচিত কোনো নারী বা পুরুষ ফাঁদে ফেলে গ্রামের সহজ-সরল গৃহবধূদের স্বর্ণালংকার ও টাকাপয়সা হাতিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব নারীদের পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ভয়ংকর ঘটনাও ঘটে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পুলিশে দায়ের করা এমন নিখোঁজ ডায়েরির প্রায় ৬০% থেকে ৭০% ক্ষেত্রেই নিখোঁজ নারীদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে বাকি ৩০% ক্ষেত্রে তাদের আর কোনো খোঁজই মেলে না। তাই অনিকার পরিবার এখন তার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ১০০% চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছে।

এই রহস্যজনক নিখোঁজের বিষয়ে পুঠিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, “অনিকা খাতুন নিখোঁজের বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। নিখোঁজ গৃহবধূকে দ্রুত উদ্ধারে পুলিশ ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমরা তার মোবাইল ফোনের কল লিস্ট বা সিডিআর চেক করে তার সর্বশেষ অবস্থান জানার চেষ্টা করছি। পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং আমাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।”

অনিকা খাতুনের পরিবার এখন শুধু তার সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। অনিকার স্বামী ও স্বজনরা দেশের সব সাধারণ মানুষের কাছে একটি আকুল আবেদন জানিয়েছেন। যদি কোনো সহৃদয় ব্যক্তি অনিকা খাতুন বা তার বান্ধবী রিতুর কোনো সন্ধান পেয়ে থাকেন, তবে যেন দ্রুত নিকটস্থ থানায় অথবা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একটু সহযোগিতা হয়তো একটি পরিবারকে তাদের হারানো মেয়েকে ফিরে পেতে সাহায্য করতে পারে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ