বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার অভিযোগ: ইরানে কড়া জবাব দিল যুক্তরাষ্ট্র

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরার যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, তা আবারও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। একটি পণ্যবাহী বাণিজিক জাহাজে ইরানি ড্রোনের হামলার অভিযোগ ওঠার মাত্র এক দিনের মাথায় ইরানে নতুন করে সরাসরি সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর সব ধরনের সামরিক কার্যক্রম দেখভাল করা ‘ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড’ বা সেন্টকম শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। তারা অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানিয়েছে যে, গত বৃহস্পতিবার ইরানের চালানো হামলার এটি একটি ‘কড়া জবাব’। এই পাল্টা হামলার ফলে ওই অঞ্চলে আবারও একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হওয়ার জোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সেন্টকম তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিস্তারিত জানিয়ে বলেছে, “আমাদের মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ইরানের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন রাখার গোপন জায়গা এবং তাদের উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলোতে সরাসরি হামলা চালিয়েছে।” তারা ইরানের কঠোর সমালোচনা করে আরও বলেছে, “বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ বা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যখন ব্যবসা-বাণিজ্য ধীরে ধীরে বাড়ছে, ঠিক তখন ইরানের এমন বিপজ্জনক ও বেপরোয়া আচরণ নৌ চলাচলের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।” সেন্টকমের এই ঘোষণার পরপরই ইরানের সিরিক বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় মার্কিন হামলার খবর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে শুক্রবার দিনের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ্য করে একটি কড়া সতর্কবার্তা দেন। তিনি সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এভার লাভলি’-তে হওয়া ড্রোন হামলাকে গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের একটি ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ওই শান্তি সমঝোতা স্মারকটি সই হয়েছিল। ওই সমঝোতায় খুব পরিষ্কার করে বলা হয়েছিল যে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সব ধরনের সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। এর মাধ্যমেই মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি স্থগিত করা হয়েছিল।

তবে এই সমঝোতা স্মারকটি কোনো চূড়ান্ত বা স্থায়ী চুক্তি ছিল না। বরং এটিকে পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ বা ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বৈশ্বিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচলের বিষয়টিও এই আলোচনার একটি বড় অংশ ছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরান নিজেদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এই প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, সারসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে অন্তত ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেড়ে যায়।

ওই সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি করার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা ঠিক করা হয়েছিল। এই ৬০ দিন কোনো ধরনের টোল বা মাশুল ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ওই প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে দেওয়ার জন্য ইরানকে ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, সমঝোতার শর্ত সরাসরি লঙ্ঘন করে ইসরায়েল লেবাননে টানা ও নির্বিচার হামলা চালিয়ে যায়। এর কড়া জবাবে ইরান গত সপ্তাহে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার কারণে তারা আবারও হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।

ঠিক এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই বৃহস্পতিবার ওমান উপকূলের কাছে এই নৌপথ দিয়ে যাওয়ার সময় ‘এভার লাভলি’ নামের জাহাজটিতে আকাশ থেকে আসা একটি বস্তু সজোরে আঘাত হানে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এতে জাহাজের কোনো নাবিক বা কর্মী হতাহত হননি। ফলে কনটেইনারবাহী বিশাল এই জাহাজটি কোনোমতে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর দিকে ইরান অন্তত চারটি একমুখী হামলার ড্রোন (ওয়ান ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন) ছুড়েছে।

ট্রাম্প জানান, মার্কিন বাহিনী তিনটি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করতে পারলেও চতুর্থ ড্রোনটি তার লক্ষ্যবস্তুতে ঠিকই আঘাত হানে। শুক্রবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভার লাভলি জাহাজ প্রসঙ্গে ট্রাম্প লেখেন, “ড্রোনগুলোর একটি খুব দামি ও বিশাল আকৃতির পণ্যবাহী জাহাজের ওপরের অংশে শক্তভাবে আঘাত করেছে।” পরে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা ট্রাম্পের কাছে জানতে চান, ১৭ জুনের সমঝোতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল আছে কি না। এর জবাবে ট্রাম্প বলেন, “গতকাল তারা যে হামলা চালিয়েছে, সেটা আমার মোটেও পছন্দ হয়নি। তাদের এমনটা করা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। তাই আপনারা শিগগিরই এর চরম পরিণতি দেখতে পাবেন।” ট্রাম্পের এই কথার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানে হামলা চালায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ