ফুটবল মাঠে একজন খেলোয়াড়ের ‘মাস্টারক্লাস’ পারফরম্যান্স বলতে যা বোঝায়, আজ ঠিক সেটাই করে দেখালেন ফরাসি তারকা উসমান দেম্বেলে। প্রথমার্ধে নরওয়ে রক্ষণভাগের সামনে তিনি যেন রীতিমতো এক মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে হাজির হয়েছিলেন। একটু মজা করে বললে বলতে হয়, ম্যাচের প্রথম ভাগে দেম্বেলে আসলে ‘মাস্টার’ বা শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নরওয়ে রক্ষণভাগের ‘ক্লাস’ নিয়েছেন। আর তার এই দুর্দান্ত ক্লাসের ফলাফল? ম্যাচের মাত্র ৩২ মিনিটের মধ্যেই অসাধারণ এক হ্যাটট্রিক! বোস্টনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে দেম্বেলের জাদুতে নরওয়েকে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে শক্তিশালী ফ্রান্স।
দেম্বেলের এই হ্যাটট্রিকটি মোটেও সাধারণ কোনো হ্যাটট্রিক ছিল না। এটি ছিল বিশ্বকাপের সর্বশেষ ৭২ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম হ্যাটট্রিক করার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড। ম্যাচের ৭, ২০ এবং ৩২ মিনিটে নরওয়ের জালে বল জড়িয়ে তিনি এই অনন্য রেকর্ডটি নিজের করে নেন। প্রথমার্ধেই ৩-১ গোলে এগিয়ে থাকার পর, দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা অতিরিক্ত সময়ে ফ্রান্সকে আরও একটি গোল এনে দেন একাদশে ফেরা তরুণ ফরোয়ার্ড দেজিরে দুয়ে। এই দাপুটে জয়ের মাধ্যমে ‘আই’ গ্রুপে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে অপরাজিত গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই নকআউট বা শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে পা রাখল কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স।
শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ কে হবে, তা এখনো ১০০% নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় শুরু হতে যাওয়া সেই নকআউট ম্যাচে ফ্রান্সের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হতে পারে ‘সি’, ‘ডি’, ‘এফ’, ‘জি’, অথবা ‘এইচ’ গ্রুপের মধ্যে তৃতীয় সেরা হওয়া কোনো একটি দল। ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ম্যাচে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ হিসেবে সুইডেন আসার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
দেম্বেলের গতির সামনে দাঁড়াতে না পারলেও, নরওয়ে কিন্তু প্রথমার্ধেই একটি গোল আদায় করে নিয়েছিল। ম্যাচের ২১ মিনিটে ডি-বক্সের ভেতর দারুণভাবে জায়গা বের করে নিয়ে চমৎকার এক শটে গোল করেন নরওয়ের মিডফিল্ডার থেলো অসগার্ড। নরওয়ে চাইলে ম্যাচের ব্যবধান আরও কমাতে পারত। ম্যাচের ৫০ মিনিটে তারা একটি পেনাল্টি পেয়েছিল, কিন্তু ইয়র্গেন স্ট্রান্ড লারসেন সেই সুবর্ণ সুযোগটি কাজে লাগাতে চরমভাবে ব্যর্থ হন। তার নেওয়া দুর্বল শটটি খুব সহজেই ঠেকিয়ে দেন ফ্রান্সের গোলরক্ষক মাইক মাইনিয়ঁ।
তবে এই ম্যাচে নরওয়ের কৌশল নিয়ে বেশ আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। কারণ, আগের ২ ম্যাচে ৪ গোল করা তাদের সবচেয়ে বড় তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ডকে এই ম্যাচে পুরো সময় বেঞ্চে বসিয়ে রেখে নরওয়ে কোচ সবাইকে কিছুটা চমকে দেন। শুধু হলান্ডই নন, একাদশে মোট ১০টি বড় ধরনের পরিবর্তন আনে তারা। দেখে মনে হচ্ছিল, মূল দলের খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে নরওয়ে যেন তাদের ‘দ্বিতীয় দল’ মাঠে নামিয়েছে। হলান্ড মাঠে থাকলে হয়তো নরওয়ে এই ম্যাচে আরও কয়েকটি গোল পেতে পারত। এই ম্যাচ হেরে ‘আই’ গ্রুপে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হয়েই নকআউটে যেতে হলো নরওয়েকে। শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ ‘ই’ গ্রুপের রানার্সআপ দল আইভরিকোস্ট। আগামী মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় ডালাসে এই ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে।
‘আই’ গ্রুপের অন্য একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে কানাডার টরন্টো স্টেডিয়ামে। সেখানে দুর্বল ইরাকের জালে রীতিমতো গোল উৎসব করেছে আফ্রিকার দেশ সেনেগাল। সাদিও মানেরা ইরাককে ৫-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছে। ম্যাচের ১৩ মিনিটে ইরাকের রেবিন সুলাকা সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে ইরাক ১০ জনের দলে পরিণত হয়। আর এই সুযোগটিই পুরোপুরি কাজে লাগায় সেনেগাল। গ্রুপের তৃতীয় সেরা দল হিসেবে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ওঠার জন্য তারা নিজেদের গোল ব্যবধান বাড়িয়ে নেয়।
সব মিলিয়ে ৩ ম্যাচ শেষে ৯ পয়েন্ট নিয়ে ‘আই’ গ্রুপের শীর্ষে আছে ফ্রান্স। দ্বিতীয় স্থানে থাকা নরওয়ের সংগ্রহ ৬ পয়েন্ট। অন্যদিকে ৩ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট পেয়ে তৃতীয় স্থানে আছে সেনেগাল। গ্রুপ পর্বে ৮টি গোল করার পাশাপাশি ৬টি গোল হজম করায় সেনেগালের বর্তমান গোল ব্যবধান +২। এখন গ্রুপের তৃতীয় সেরা দল হিসেবে শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে উঠতে সেনেগালকে অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে হবে। আর ৩ ম্যাচে কোনো পয়েন্ট না পাওয়ায় ইরাক শূন্য হাতে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল।














