পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বন বিভাগের এক প্রশংসনীয় উদ্যোগে গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি বিশাল সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। শ্রীপুর রেঞ্জের সাতখামাইর বিটের অন্তর্গত পেলাইদ মৌজায় প্রায় ৫ একর আয়তনের এই বনভূমি দীর্ঘদিন ধরে কিছু অসাধু মানুষের অবৈধ দখলে ছিল। অবশেষে গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে বন বিভাগ অভিযান চালিয়ে এই জমি সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। শুধু জমি উদ্ধার করেই বন বিভাগ থেমে থাকেনি, ওই এলাকায় আবার পুরোনো গজারী বন ফিরিয়ে আনতে তারা ইতিমধ্যে সেখানে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু করেছে।
বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, একসময় এই পুরো পেলাইদ মৌজাটি প্রাকৃতিক ও ঘন গজারী গাছে আচ্ছাদিত ছিল। এই বন ছিল এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক বড় অংশ। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কিছু লোভী ও অবৈধ দখলদার বনভূমির এই মহামূল্যবান গজারী গাছগুলো রাতের অন্ধকারে কেটে বিক্রি করে দেয়। তারা ধীরে ধীরে পুরো ৫ একর জমি নিজেদের দখলে নিয়ে সেখানে অবৈধভাবে বিশাল কলা বাগান গড়ে তোলে। একটি বড় গজারী গাছ বিক্রি করলে অনেক সময় ২০০থেকে৩০০(ডলার) বা ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। এই লোভের কারণেই তারা দেশের এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ১০০% ধ্বংস করে ফেলেছিল।
সম্প্রতি ঢাকা বন বিভাগের কঠোর নির্দেশনায় শ্রীপুর রেঞ্জ এই দখলমুক্ত অভিযান পরিচালনা করে। বন বিভাগের কর্মকর্তা ও বনরক্ষীরা বুলডোজার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নিয়ে অবৈধ কলা বাগান উচ্ছেদ করেন এবং প্রায় ৫ একর সরকারি জমি সফলভাবে পুনরুদ্ধার করেন। জমি উদ্ধারের পরপরই বনভূমির পরিবেশ ও হারানো জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে সেখানে নতুন করে বৃক্ষরোপণ শুরু হয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, সেখানে শুধু গজারী গাছই নয়, এর পাশাপাশি মেহগনি, সেগুন, কড়ইসহ বিভিন্ন দামি বনজ প্রজাতির কয়েক হাজার চারা রোপণ করা হচ্ছে।
ঢাকা বন বিভাগের শ্রীপুর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান এই সফল অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। তিনি জানান, সংরক্ষিত বনভূমি রক্ষা এবং প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধারে বন বিভাগের এ ধরনের অভিযান আগামী ভবিষ্যতেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বনভূমি যেন পুনরায় কেউ দখল করতে না পারে বা নতুন করে বন উজাড় না হয়, সে বিষয়ে বনরক্ষীদের নিয়মিত নজরদারি ও টহল আগের চেয়ে অন্তত ৫০% জোরদার করা হয়েছে। যারা সরকারি বনভূমি দখল করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করে দেন।
স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও পরিবেশ সচেতন মহল বন বিভাগের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে মন থেকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে এখন অতিবৃষ্টি, খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক বেড়ে গেছে। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় এবং দেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এমন বনায়ন কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই। দখলমুক্ত হওয়া এই ৫ একর বনভূমিতে যদি পুনরায় গজারী বন গড়ে ওঠে, তবে তা এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জলবায়ুর উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও আবহাওয়া ঠিক রাখতে এর মোট আয়তনের অন্তত ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের চেয়ে বেশ কম। তাই সরকারি ও খাস জমিগুলো দখলমুক্ত করে সেখানে এমন বৃক্ষরোপণ করলে দেশের বনভূমির পরিমাণ যেমন বাড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষও বিশুদ্ধ বাতাস পাবে। স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন, শুধু গাছ লাগালেই হবে না, আগামী ৩ থেকে ৪ বছর এই ছোট চারাগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে এগুলো বড় গাছে পরিণত হতে পারে।














