মাদকের বিষাক্ত ছোবল থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং সমাজকে কলুষমুক্ত করতে দেশজুড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মাঝে ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদকের বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন এখন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানা পুলিশ একটি সফল ও সাহসী অভিযান চালিয়েছে। শৈলকুপার বড়ুলিয়া গ্রামের নদীর পাড় থেকে ২০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ চারজন চিহ্নিত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে তারা। পুলিশের এই সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।
আটককৃত এই চার মাদক কারবারির পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। এরা হলো শৈলকুপা থানার অনন্ত বাদাল শো গ্রামের নিশিকান্ত পোদ্দারের ছেলে হৃদয় পোদ্দার (২৯), রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার নিভা গ্রামের স্বরেশ চন্দ্র বিশ্বাসের ছেলে সীমান্ত বিশ্বাস (২৮), কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার দক্ষিণ মূলগ্রামের মো. রজব আলীর ছেলে মো. রাজ (২৩) এবং একই গ্রামের দুর্লভ শেখের ছেলে মো. রাকিবুল ইসলাম (৩০)। এদের সবার বয়স ২৩ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এত অল্প বয়সে তরুণদের এমন জঘন্য মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষকে রীতিমতো অবাক ও হতাশ করেছে। এই বয়সে তাদের কোনো ভালো পেশায় যুক্ত থাকার কথা, কিন্তু তারা টাকার লোভে জড়িয়ে পড়েছে এই মরণনেশার ব্যবসায়।
ঘটনার দিন পুলিশের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। পুলিশ জানতে পারে যে, শৈলকুপার বড়ুলিয়া গ্রামের আলাল উদ্দিন বিশ্বাসের বাড়ির সামনের নদীর পাড়ে কয়েকজন যুবক ইয়াবা কেনাবেচার জন্য অবস্থান করছে। নদীর পাড় বা নির্জন এলাকাগুলো সাধারণত জনবসতি থেকে একটু দূরে হওয়ায় অপরাধীরা এগুলোকে নিজেদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নেয়। খবর পাওয়ার পরপরই শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় সাধারণ পোশাকে ওত পেতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওই চার যুবক সেখানে পৌঁছালে পুলিশের সন্দেহ হয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সতর্ক পুলিশ সদস্যরা চারপাশ ঘিরে ফেলে তাদের চারজনকে দৌড়ে ধরে ফেলেন। এরপর তাদের শরীর তল্লাশি করে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ২০ পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে পুলিশ।
বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য মতে, দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। আন্তর্জাতিক কালো বাজারে খুব কম দামে তৈরি হওয়া একেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট তারা সাধারণ তরুণদের কাছে ২থেকে৩(ডলার) বা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে। এই ব্যবসায় তারা প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত অবৈধ মুনাফা লাভ করে থাকে।
মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।
শৈলকুপা থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া এই চারজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইবে, যাতে এই ২০ পিস ইয়াবার মূল চালান কোথা থেকে এসেছে এবং কারা এর আসল সরবরাহকারী বা গডফাদার, সেই প্রকৃত তথ্য বের করে আনা যায়। তিন জেলার (ঝিনাইদহ, রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া) অপরাধীরা মিলে কীভাবে একটি চক্র গড়ে তুলেছে, পুলিশ সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে পুলিশ বদ্ধপরিকর।
বড়ুলিয়া গ্রামের মতো একটি আবাসিক এলাকায় এমন মাদকের আখড়া গড়ে ওঠায় স্থানীয় অভিভাবকরা এতদিন চরম আতঙ্কে দিন পার করছিলেন। কারণ, এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই এই মাদক কারবারিদের পাতা ফাঁদে পড়ে বিপথগামী হতে পারে। আজ এই চার মাদক কারবারি পুলিশের হাতে আটক হওয়ায় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা পুলিশের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। সাধারণ মানুষও যদি ভয় না পেয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে, তবে সমাজ থেকে এই মরণব্যাধি খুব দ্রুতই চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।
















