চট্টগ্রাম নগরীর বিখ্যাত রানী রাসমনি ইলিশ ঘাটে প্রতিদিন হাজার হাজার জেলের পদচারণা থাকে। এই ঘাট থেকে মাছ বিক্রি করেই তারা নিজেদের পরিবারের মুখে অন্ন জোগান। কিন্তু এই সাধারণ খেটে খাওয়া জেলেদের জীবন এখন চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। খাস কালেকশনের নামে দিনের পর দিন চলা অবৈধ চাঁদাবাজির কারণে তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। চাঁদাবাজদের হাত থেকে নিজেদের রুটিরুজি বাঁচাতে ২৪ জুন সকালে ঘাটসংলগ্ন সড়কে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন জেলে সম্প্রদায়ের শত শত সদস্য।
সোমবার সকালে জেলেরা তাদের রোজগারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার মাছ, বরফ ও গ্যাস সিলিন্ডার রাস্তার ওপর রেখে এক ব্যতিক্রমী ও প্রতীকী প্রতিবাদ জানান। এ সময় অংশগ্রহণকারীদের হাতে চাঁদাবাজি বন্ধের বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার দেখা যায়। তাদের মূল অভিযোগ, ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে খাস কালেকশনের নাম করে কিছু অসাধু চক্র তাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ বা চাঁদা আদায় করছে। এই চাঁদাবাজির কারণে তাদের দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনা করা এখন প্রায় ১০০% কঠিন হয়ে পড়েছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সাধারণ জেলেরা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে তাদের কষ্টের কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, শুধু মাছ বিক্রি করলেই যে চাঁদা দিতে হয় তা নয়, ঘাটে নৌকা ভেড়ানো, মাছ অবতরণ করা, জাল ও রশি নামানো, এমনকি বরফ ও গ্যাস সিলিন্ডার কেনার মতো প্রতিটি ছোটখাটো কাজের ওপরও নিয়মিতভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এই অতিরিক্ত চাঁদা দিতে গিয়ে অনেক জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। হিসাব করে দেখা গেছে, একজন জেলের মাসিক আয়ের প্রায় ১৫% থেকে ২০% অংশ শুধু এই অবৈধ চাঁদা দিতেই চলে যায়। বর্তমান বাজারে এই টাকার মূল্য অনেক, যা তাদের সংসার চালানোর পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা আরও অভিযোগ করেন যে, রানী রাসমনি ইলিশ ঘাট দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যঘাটগুলোর একটি হওয়া সত্ত্বেও এখানে কর্মরত জেলেরা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অমানবিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রাত জেগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর থেকে মাছ ধরে ঘাটে আসার পর, বিভিন্ন অজুহাতে তাদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ নেওয়া হচ্ছে। চাঁদা না দিলে তাদের মাছ বিক্রি করতে দেওয়া হয় না বা মারধর করা হয়। অনেক সময় মাছ পচে যাওয়ার ভয়ে জেলেরা বাধ্য হয়ে চাঁদা দিয়ে দেন। এর কারণে অনেক জেলের লাভের অংশ শূন্যের কোঠায় নেমে আসছে এবং তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন।
এই চাঁদাবাজির শিকার শুধু জেলেরাই নন। ঘাটে কর্মরত সাধারণ দিনমজুর শ্রমিক, নৌকার মাঝি, ছোট মাছ ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন পণ্যের ক্ষুদ্র বিক্রেতারাও একই ধরনের চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন বলে তারা দাবি করেন। একটি চক্র পুরো ঘাট এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে। এসব অবৈধ কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ করতে তারা স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। যারা এই চাঁদাবাজির সাথে সরাসরি জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার জোর আহ্বান জানান বিক্ষুব্ধ জেলেরা।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বয়স্ক কয়েকজন জেলে আক্ষেপ করে বলেন, তারা শুধু শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করতে চান। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই চাঁদাবাজির পরিস্থিতির কারণে তাদের আয় অনেক কমে যাচ্ছে। তারা জানান, প্রশাসনের কাছে এর আগে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সমাধান মেলেনি। প্রশাসন নীরব থাকায় চাঁদাবাজরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী চলা এই মানববন্ধন ও বিক্ষোভে জেলে সম্প্রদায়ের শতাধিক সদস্য অংশ নেন। এ সময় ঘাট এলাকায় সাধারণ মানুষেরও ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়, যারা জেলেদের এই যৌক্তিক দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। পরে আন্দোলনকারীরা জানান, তারা খুব দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের দাবিদাওয়া সম্বলিত একটি স্মারকলিপি জমা দেবেন। রানী রাসমনি ইলিশ ঘাটের সভাপতি মো. হাসান আলী চৌধুরী এই চাঁদাবাজির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, আশপাশের অন্য কোনো ঘাটে খাস কালেকশনের নামে এমন চাঁদাবাজির কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ শুধু এই একটি ঘাটেই খাস কালেকশনের নামে সাধারণ মানুষের রক্ত চোষা হচ্ছে। অবৈধ অর্থ আদায় দ্রুত বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে তারা আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন বলে কড়া হুঁশিয়ারি দেন।














