দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলে এক বিশাল দুর্নীতির ঘটনা ধরা পড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর নাম করে কাস্টমসের গোডাউন থেকে অতিরিক্ত মালামাল পাচারের চেষ্টার অভিযোগে ৫ জন কাস্টমস কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া এই অসাধু কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজন হলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা এবং বাকি তিনজন সিপাহি। এই চুরির ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে সরকারি কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া অভিযুক্ত পাঁচজন হলেন কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এবং তিন সিপাহি জামশেদ, মোহাম্মদ সাগর ও হামিদুর রহমান। জানা গেছে, গত রবিবার (২১ জুন) রাতে এই পাচারের নাটকটি সাজানো হয়েছিল। যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখার গুদামে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে এই চুরির পুরো ঘটনাটি একদম পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, রবিবার রাত ১১টা ২০ মিনিটের দিকে একটি কাভার্ডভ্যানে বেশ কয়েক বস্তা মালামাল ওঠানো হচ্ছে। এই লোডিংয়ের কাজ শেষ হতে সময় লাগে মাত্র ২৩ মিনিট। কিন্তু সন্দেহজনক ব্যাপার হলো, একই গাড়িতে রাত ১১টা ৫৮ মিনিট থেকে ১২টা ৪ মিনিটের মধ্যে আবারও কিছু মালামাল লোড করা হয়। এরপর রাত ১২টা ৪৫ মিনিট থেকে ১টা ১০ মিনিটের মধ্যে সেই একই গাড়ি থেকে অত্যন্ত গোপনে ২২ থেকে ২৫ প্যাকেজ পণ্য আনলোড করে লুকিয়ে রাখা হয়। এই পুরো সময়টাতে গোডাউনে কর্মরত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম চৌধুরী এবং সিপাহি মোহাম্মদ সাগর সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েন। তাদের এই সন্দেহজনক উপস্থিতির কারণেই মূলত তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
কাস্টমসের প্রাথমিক তদন্তে ১০০% প্রমাণ হয়েছে যে, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী ও সিপাহি মোহাম্মদ সাগর অবৈধভাবে পাচারের উদ্দেশ্যেই ট্রাকে এই অতিরিক্ত মালামাল লোড ও আনলোড করছিলেন। এই চুরির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ওই একই রাত ২টার দিকে আরেকটি বড় ধাক্কা খায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) দেওয়া গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বেনাপোল বাজারের দুর্গাপুর মোড় থেকে ওই সন্দেহভাজন কাভার্ডভ্যানটি (ঢাকা মেট্রো-ট-২৪-৫৬২১) আটক করে। কাভার্ডভ্যানটি চেক করে বিজিবি দেখতে পায়, কাস্টমস থেকে নির্ধারিত পণ্যের চেয়ে সেখানে অনেক বেশি মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, গত রবিবার কাস্টমস হাউসের নিলাম শাখা থেকে ঢাকার প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভাণ্ডারে পাঠানোর জন্য ৩,০২২টি শাড়ি, ৫৮টি থ্রি-পিস, ২০৮টি চাদর, ২৬৩টি কম্বল এবং ৮টি ওড়নার একটি চালান ইস্যু করা হয়েছিল। এই চালানের চিঠিতে সহকারী কমিশনার অব কাস্টমসের পক্ষে রাহাত হোসেন স্বাক্ষর করেছিলেন। আর এই পুরো পণ্যগুলো নিরাপদে ঢাকায় পরিবহনের দায়িত্বে ছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী। কিন্তু তিনি তার দায়িত্বের চরম অপব্যবহার করেন।
বিজিবি কাভার্ডভ্যানটি নিজেদের ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করে। তল্লাশির পর দেখা যায়, গাড়িতে থাকা মালামালের সাথে কাগজপত্রের কোনো মিল নেই। ওই ট্রাকে ভারতীয় ৬,০০৮টি শাড়ি, ৬৩টি থ্রি-পিস, ৩৮৬টি কম্বল, ২০৮টি চাদর, ৮টি ওড়না এবং ৩৩,২২২টি বিভিন্ন প্রকার দামি কসমেটিকস সামগ্রী উদ্ধার করা হয়। বিজিবির হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার করা এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্যের বর্তমান বাজারমূল্য বা সিজার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৬৭ লাখ ৬৫ হাজার ৩১০ টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে এর মূল্য প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ডলার ($) এর কাছাকাছি।
ত্রাণের আড়ালে এত বড় একটি পাচারের চেষ্টার দায়ে বিজিবি সাথে সাথেই কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, কাভার্ডভ্যানের চালক মহসিন আলী এবং হেলপার জাহিদ হাসানকে হাতেনাতে আটক করে। এই পুরো ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কাস্টমস হাউসে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয়। বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রাহাত হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “পুরো ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে এবং আমরা এর সত্যতা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই করছি। এই ঘটনার সাথে জড়িত থাকায় দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও তিন সিপাহিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”














