৯০ দশকের আলোচিত হুন্ডি সম্রাট কাজলের ভারতে মৃত্যু, এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর এবং এর আশপাশের এলাকার মানুষের কাছে নব্বইয়ের দশকের একটি অতি পরিচিত ও আলোচিত নাম ফারুক হোসেন কাজল। নব্বইয়ের দশকে তিনি এই এলাকায় হুন্ডি ব্যবসা এবং উচ্চ মুনাফার ফাঁদ পেতে রীতিমতো এক অঘোষিত ‘সম্রাট’ হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই হুন্ডি ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন কাজল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভারতে মারা গেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে তার মৃত্যুর এই খবর কোটচাঁদপুর ও ঝিনাইদহের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লায় পুরোনো সেই দিনগুলো নিয়ে নতুন করে তুমুল আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়।

স্থানীয় বয়স্ক মানুষ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা যায়, ১৯৯০-এর দশকে ফারুক হোসেন কাজল কোটচাঁদপুরসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলায় একটি বিশাল সুদভিত্তিক হুন্ডি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার ব্যবসার মূল কৌশলই ছিল সাধারণ মানুষকে অনেক বেশি মুনাফা বা লাভের প্রলোভন দেখানো। সেই সময় ব্যাংকে টাকা রাখলে যেখানে বছরে হয়তো ৮% থেকে ১০% লাভ পাওয়া যেত, সেখানে কাজল তার বিনিয়োগকারীদের মাসে মাসে আকাশছোঁয়া লাভের প্রতিশ্রুতি দিতেন। এই অতিরিক্ত ও ১০০% নিশ্চিত লাভের আশায় এলাকার হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, কৃষক, ব্যবসায়ী এমনকি অনেক চাকরিজীবীও তাদের সারা জীবনের জমানো কষ্টার্জিত অর্থ তার প্রতিষ্ঠানে চোখ বন্ধ করে বিনিয়োগ করেছিলেন।

ব্যবসাটি খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠলে কাজল তা আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। তিনি বিভিন্ন গ্রাম ও ইউনিয়নে নিজের লোক বা এজেন্ট নিয়োগ দেন। এই এজেন্টরা মূলত সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে কাজলের কাছে পৌঁছে দিত। অনেক এজেন্ট এই কাজ করে নিজেরাও তখন প্রচুর টাকা কামিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে যে, ব্যবসার শুরুর দিকে বিনিয়োগকারীরা ঠিকমতোই তাদের প্রতিশ্রুত মুনাফা পাচ্ছিলেন। এর ফলে মানুষের বিশ্বাস আরও বেড়ে যায় এবং তারা জমি বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে আরও বেশি টাকা কাজলের হাতে তুলে দিতে শুরু করেন। তখনকার হিসাবে অনেক মানুষ হয়তো ১,০০০থেকেশুরুকরে১০,০০০ডলার সমমূল্যের দেশীয় টাকা তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

কিন্তু মানুষের এই অন্ধ বিশ্বাস বেশি দিন টেকেনি। হঠাৎ করেই প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটতে শুরু করে। একপর্যায়ে কাজল সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান। এতে বহু মানুষ আর্থিকভাবে একেবারে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেন। অনেকেই তখন এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির ধাক্কা সইতে না পেরে মানসিকভাবে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে এই বিশাল অর্থ কেলেঙ্কারির দায় কেবল একা কাজলের ওপর বর্তায় নাকি এর সঙ্গে তার নিয়োগ করা স্থানীয় এজেন্ট ও অন্যান্য অংশীদারদেরও বড় কোনো ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে এখনো মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ রয়েছে। অনেক এজেন্ট তখন নিজেদের বাঁচাতে কাজলের ওপর সব দোষ চাপিয়ে পার পেয়ে গিয়েছিলেন।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, মানুষের দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবল ইচ্ছা এবং অতিরিক্ত মুনাফার লোভকে কাজে লাগিয়েই সে সময় কাজলের মতো প্রতারকরা এমন ব্যবসার বিস্তার ঘটাতে পেরেছিল। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আর্থিক বিষয়ে সচেতনতার চরম অভাব ছিল। কোনো বৈধ ব্যবসা ছাড়া কেউ কীভাবে এত বেশি লাভ দিতে পারে, সেই প্রশ্ন তখন কেউ করেনি। এই অতিরিক্ত লাভের প্রত্যাশাই অনেক মানুষকে এমন একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে আকৃষ্ট করেছিল, যার মাশুল তাদের সারা জীবন দিতে হয়েছে।

ফারুক হোসেন কাজল কীভাবে এবং ঠিক কবে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে খুব একটা পরিষ্কার তথ্য জানা যায়নি। তবে তার মৃত্যুর খবরে কোটচাঁদপুর এলাকায় পুরনো সেই হুন্ডি ব্যবসা, মানুষের কান্না এবং এর সঙ্গে জড়িত নানা ঘটনার স্মৃতি আবারও নতুন করে মানুষের আলোচনায় উঠে এসেছে। যারা একসময় তার প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এই খবরে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। এই ঘটনা আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় শিক্ষা। মানুষ যদি অতিরিক্ত লোভের ফাঁদে পা না দেয় এবং যেকোনো জায়গায় টাকা বিনিয়োগ করার আগে অন্তত ১০০ বার চিন্তাভাবনা করে, তবেই এমন প্রতারকদের হাত থেকে বাঁচা সম্ভব।

সম্পর্কিত নিবন্ধ