রাতের অন্ধকারে হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের প্রথম ভরসার জায়গা হলো সরকারি হাসপাতাল। কিন্তু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর যদি ডাক্তার জরুরি ওষুধ লিখে দেন আর সেই ওষুধ কিনতে গিয়ে দেখা যায় আশপাশের সব ফার্মেসি বন্ধ, তখন রোগীর স্বজনদের মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। ঠিক এমন এক ভয়ংকর ও অসহায় পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার একজন বাসিন্দা। গভীর রাতে নিজের অসুস্থ বোনের জন্য ওষুধ কিনতে না পেরে তিনি চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য জনাব হাফেজ ইব্রাহিম, বোরহানউদ্দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং বাজার কমিটির প্রতি জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি আবেগঘন আবেদন জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী ওই ব্যক্তি জানান, গত রাতে তার বড় বোন হঠাৎ করে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবস্থা খারাপ দেখে তিনি রাত ২টার দিকে বোনকে নিয়ে দ্রুত বোরহানউদ্দিন সরকারি হাসপাতালে ছুটে যান। জরুরি বিভাগে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তার বোনের অবস্থা পরীক্ষা করে একটি জরুরি ইনজেকশন ও স্যালাইন লিখে দেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে তিনি দেখেন, গেটের সামনের সব কটি ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান পুরোপুরি বন্ধ। একটি দোকানও খোলা নেই। তিনি অনেক ডাকাডাকি করেও কাউকে পাননি। এই অবস্থায় তিনি চরম দিশেহারা হয়ে পড়েন।
জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে তিনি অসুস্থ বোনকে হাসপাতালের বেডে ফেলে রেখে একটি গাড়ি ভাড়া করে সোজা ভোলা শহরে ছোটেন। বোরহানউদ্দিন থেকে ভোলা শহরে গিয়ে ওষুধ কিনে আবার হাসপাতালে ফিরে আসতে তার প্রায় ৪০ মিনিট সময় লেগে যায়। এই ৪০ মিনিট তার কাছে মনে হয়েছিল যেন ৪০ বছরের সমান। ওষুধ নিয়ে ফিরে এসে তিনি দেখেন, ওষুধের অভাবে তার বোনের শারীরিক অবস্থা আরও অনেক বেশি খারাপ হয়ে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “স্যার, এই ৪০ মিনিট মানে একটা মানুষের জীবন-মরণের পার্থক্য। একটু দেরি হলে হয়তো আমার বোনকে আর বাঁচানোই যেত না।”
ভুক্তভোগী এই ব্যক্তি স্থানীয় সংসদ সদস্য হাফেজ ইব্রাহিম সাহেবের কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “মাননীয় এমপি মহোদয়, আপনি বোরহানউদ্দিন এবং দৌলতখান উপজেলার প্রায় ৫ লাখ মানুষের অভিভাবক। সাধারণ মানুষ আপনাকে ভোট দিয়ে নেতা বানিয়েছে। আপনার কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ, বোরহানউদ্দিন হাসপাতাল গেটের সামনে যে ৫টি বড় ফার্মেসি আছে, বাজার কমিটির মাধ্যমে তাদের সাথে কথা বলে প্রতিদিন অন্তত একটি দোকানকে ‘নাইট ডিউটি ফার্মেসি’ হিসেবে ঘোষণা করে দিন।”
তার প্রস্তাবটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সহজ। তিনি জানান, ৫টি দোকান যদি পালা করে প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে, তবে কোনো দোকানদারেরই খুব বেশি কষ্ট হবে না। রাতে ডিউটি করার জন্য যদি দোকানদাররা ওষুধের দামের সাথে অতিরিক্ত কিছু ‘নাইট চার্জ’ বা ফি নেন, তাহলেও সাধারণ মানুষ সেটা খুশিমনেই দিতে রাজি আছেন। এতে দোকানদারেরও কোনো আর্থিক ক্ষতি বা লোকসান হবে না, উল্টো মানুষের জীবন বাঁচবে। বর্তমানে অনেক জায়গায় এমন সেবা চালু আছে, যেখানে রাতে ওষুধ কিনলে হয়তো ৫বা১০(ডলার) সমমূল্যের সামান্য কিছু টাকা বেশি দিতে হয়, কিন্তু মানুষ বিপদের সময় সেটা গায়ে মাখে না।
তিনি আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, “স্যার, আজ ওষুধের জন্য আমি কেঁদেছি। কাল হয়তো আপনারই কোনো ভোটার, আপনার এলাকার কোনো সাধারণ মা-বোন এভাবে কাঁদবে। সরকারি হাসপাতালের গেটে দাঁড়িয়েও যদি মানুষ জরুরি ওষুধ না পায়, তবে জনগণ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?” এই সমস্যা শুধু বোরহানউদ্দিনের নয়, দেশের অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের চিত্রই এমন। রাতে হাসপাতাল খোলা থাকলেও ওষুধের দোকান বন্ধ থাকায় রোগীদের ১০০% ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
তিনি আল কুরআনের একটি সুন্দর বাণী উল্লেখ করে বলেন, “একটি জীবন বাঁচানো মানে সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচানো।” তাই তিনি এলাকার সব বিবেকবান মানুষ, সুশীল সমাজ এবং তরুণদের একজোট হয়ে এই যৌক্তিক দাবিটি বাস্তবায়নের জন্য আওয়াজ তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সবাইকে এই বার্তাটি শেয়ার করার এবং এমপি সাহেব, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বাজার কমিটিকে ট্যাগ করার অনুরোধ করেন। সাধারণ মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের একটিমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত হাজারো মানুষের রাতের ঘুম ও মানসিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এই মানবিক সমস্যার সমাধান করে।














