বান্দরবানে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের কড়া শাস্তি: ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর ৪ নেতা বহিষ্কার

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুন অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে মেনে চলা হয়। কারণ, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক দলগুলোর যেকোনো ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা বা ভুল পদক্ষেপ পাহাড়ের সাধারণ মানুষের শান্তি নষ্ট করতে পারে। ঠিক এমন একটি কঠোর অবস্থানের প্রমাণ দিল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। দলীয় শৃঙ্খলা ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে বান্দরবানে দলের চারজন পরিচিত নেতাকে সব ধরনের কার্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে দলটি। এই আকস্মিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের ফলে পাহাড়ের স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে বান্দরবান শহরের উজানীপাড়ায় অবস্থিত ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর নিজস্ব দলীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। অত্যন্ত গুরুগম্ভীর পরিবেশে এই সংবাদ সম্মেলনে বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন দলের সাধারণ সম্পাদক মংশৈ প্রু ত্রিপুরা। সংবাদ সম্মেলনে দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন, যা প্রমাণ করে যে এই সিদ্ধান্তটি দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন দলের সভাপতি উবামং মারমা, সহ-সভাপতি তনদির বমরাম তনসাং বম (যিনি মালেক নামেও পরিচিত) এবং দলের প্রধান সমন্বয়ক আশিষ ত্রিপুরা। তাদের উপস্থিতিতেই সাধারণ সম্পাদক লিখিত ঘোষণাপত্রটি পাঠ করে শোনান।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত ঘোষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে এবং দলের গঠনতন্ত্রের সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করার কারণেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বহিষ্কৃত হওয়া ওই চার নেতা হলেন অটল চাকমা, মংএ মারমা, অনুপম চাকমা (অনু) এবং জীবন ত্রিপুরা। আজ থেকে তারা দলের কোনো পদে বা সাংগঠনিক কোনো দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। দলের সাধারণ সম্পাদক জানান, এই চার নেতার বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরেই সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীদের কাছ থেকে নানা ধরনের অভিযোগ আসছিল। শেষ পর্যন্ত অভিযোগের ১০০% সত্যতা পাওয়ার পরই তাদের বিরুদ্ধে এই চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো।

ঘোষণাপত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক পরিষ্কার করে বলেছেন, আজ থেকে বহিষ্কৃত এই চার ব্যক্তি যদি ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের নাম বা পরিচয় ব্যবহার করে পাহাড়ে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজ, চাঁদাবাজি কিংবা উচ্ছৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে জড়িত হন, তবে তার কোনো দায়ভার দল বহন করবে না। স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকেও এই বিষয়ে সজাগ থাকার অনুরোধ করা হয়েছে। পাহাড়ের রাজনীতিতে অনেক সময় দেখা যায়, বহিষ্কৃত নেতারা দলের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও জুমচাষিদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন। অনেক সময় এই চাঁদার পরিমাণ বছরে কয়েক হাজার ডলার ($) বা লাখ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। দল এই ধরনের কোনো অবৈধ কাজের দায় নিতে একেবারেই প্রস্তুত নয়।

দলীয় বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা যায়, এই চার নেতাকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্তটি খুব সহজে বা এক দিনে নেওয়া হয়নি। গত কয়েক দিন আগে বান্দরবান জেলা কমিটির এক অত্যন্ত গোপনীয় ও জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। ওই সভায় দলের শীর্ষ নেতারা দলের আদর্শ, নীতি ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে তাদের কঠোর অবস্থানের কথা আবারও সবার সামনে তুলে ধরেন। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, দলের চেয়ে কোনো ব্যক্তি কখনোই বড় হতে পারে না। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর নেতারা সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান, দল সর্বদা যেকোনো ধরনের শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি মেনে চলে। এখানে অপরাধ করলে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।

বহিষ্কৃত ওই চার নেতাকে ইতিমধ্যে কড়া ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই দলীয় প্যাড, নাম বা পরিচয় ব্যবহার করে কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা না করেন। যদি তারা এই নির্দেশ অমান্য করেন, তবে দল তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন থেকে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি একটি কড়া বার্তাও দেওয়া হয়েছে। সবাইকে সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও শৃঙ্খলা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। নেতারা বলেন, পাহাড়ে শান্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য আমাদের একটি সুশৃঙ্খল দল দরকার। বিশৃঙ্খলাকারীদের দলে কোনো স্থান নেই।

বান্দরবানের সাধারণ মানুষ দলের এই কঠোর সিদ্ধান্তকে বেশ ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তারা মনে করেন, পাহাড়ে শান্তি বজায় রাখতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে এমন পরিচ্ছন্নতা অভিযান খুব বেশি জরুরি। দলগুলোর এমন জিরো টলারেন্স নীতি সাধারণ মানুষকে চাঁদাবাজি ও হয়রানির হাত থেকে বাঁচাবে বলে তারা আশা করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ