দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় আঘাত হেনেছে এক ভয়াবহ ও শক্তিশালী ভূমিকম্প। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ১ মাত্রার এই প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে পুরো দেশ যেন কেঁপে ওঠে। দেশটির রাজধানী কারাকাসের খুব কাছে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, এর ঝাঁকুনি প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়াতেও খুব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। এই আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস (USGS) এই ভূমিকম্পের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় ঠিক সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে ভূমিকম্পটি ভেনেজুয়েলার মন্টালবান এলাকায় প্রথম আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১৩ দশমিক ২ কিলোমিটার গভীরে। সাধারণত ভূমিকম্পের কেন্দ্র ভূপৃষ্ঠের যত কাছাকাছি থাকে, তার ধ্বংসক্ষমতা তত বেশি হয়। তাই এই অগভীর উৎপত্তিস্থলের কারণে ভূমিকম্পের সময় মাটির ওপরের ঝাঁকুনি অনেক বেশি তীব্র ছিল, যা সাধারণ মানুষের মনে মৃত্যুভয় ঢুকিয়ে দেয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়ো ঘটনার পরপরই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি কথা বলেন। তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে নিশ্চিত করেন যে, রাজধানী কারাকাসে ভূমিকম্পের কারণে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে। উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের কাজ শুরু করেছেন। তবে এই ঘটনায় ঠিক কতজন মানুষ হতাহত হয়েছেন, তা এখনো ১০০% নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভেনেজুয়েলার জন্য এক বিরাট ধাক্কা।
ভূমিকম্পের পরপরই সাগরের আশপাশের দেশগুলোর জন্য নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ইউএস সুনামি ওয়ার্নিং সিস্টেমের সর্বশেষ তথ্যমতে, এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণে ভেনেজুয়েলা, আরুবা এবং বোনেয়ারের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য সুনামির ঝুঁকি বা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সাগরের পানির উচ্চতা হঠাৎ বেড়ে গিয়ে উপকূলীয় শহরগুলোতে আছড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ছাড়া পুয়ের্তো রিকো এবং ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের মতো ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্যও বিশেষ সতর্কতামূলক পরামর্শ জারি করা হয়েছে। এসব এলাকার মানুষদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সাথে সাথেই কারাকাসের বাসিন্দারা নিজেদের জীবন বাঁচাতে দ্রুত ভবন থেকে বাইরে নিরাপদ ও খোলা স্থানে সরে যান। চারদিকে তখন শুধু মানুষের চিৎকার আর কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। কারাকাসের এক প্রত্যক্ষদর্শী তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “ভূমিকম্পের সময় মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটি বুঝি ভেঙে পড়বে। আমার অ্যাপার্টমেন্টের দেয়ালে বিশাল ফাটল দেখা দিয়েছে এবং জানালার সব কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে।”
বিখ্যাত বার্তা সংস্থা এএফপির এক সাংবাদিকের তোলা একটি ছবিতে কারাকাসের একটি ভবনের করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। ছবিতে দেখা যায়, একটি বড় ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং চারদিকে শুধু ধুলো আর ইট-পাথর ছড়িয়ে আছে। স্থানীয়রা ধারণা করছেন, ধ্বংস হওয়া এই ভবনটি হয়তো একটি ব্যাংক ছিল। এমন বড় বড় ভবন ধসে পড়ার দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। উদ্ধারকাজে ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও হাত লাগিয়েছেন।
শুধু ভেনেজুয়েলাই নয়, প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতার বাসিন্দারাও এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের কাঁপুনি খুব ভালোভাবে অনুভব করেছেন বলে জানা গেছে। ভূমিকম্পের সময় বোগোতার অনেক বহুতল ভবন দুলতে শুরু করে। সেখানকার প্রশাসন কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে সতর্কর্তামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দ্রুত কিছু মানুষকে ভবন থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়। দুই দেশের সাধারণ মানুষই এখন চরম আতঙ্কের মধ্যে রাত পার করছেন।
















