সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলমের হঠাৎ বদলি নিয়ে দেশজুড়ে যে আলোচনা-সমালোচনা চলছে, এবার তা নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বুধবার বিকেলে সিলেট সফরে এসে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ডিসির এই বদলি মূলত একটি ‘রুটিন ওয়ার্ক’ বা নিয়মিত প্রশাসনিক কাজের অংশ মাত্র। মাজারের দানবাক্স সিলগালা করার ঘটনার কারণেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলেন, “এটা নিতান্তই কাকতালীয়। এই বদলি আগেও হতে পারত, আবার পরেও হতে পারত।”
তবে মন্ত্রী বিদায়ী ডিসির কাজের বেশ প্রশংসাও করেছেন। তিনি বলেন, “ডিসি সারওয়ার আলম মাজারের স্বচ্ছতা নিয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমরা মনে করি, এ ধরনের স্বচ্ছতার পদক্ষেপে প্রশাসনকে ১০০% সহযোগিতা করা প্রয়োজন।” তিনি আরও জানান, সরকারের পক্ষ থেকে মাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সব ধরনের সাহায্য করা হবে। সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, তা খুব শিগগিরই পূরণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
মাজারের ৭০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য নিয়ে সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে আরেকটি সভার পর মন্ত্রী আবারও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেন যে, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের আর্থিক হিসাব-নিকাশে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগে কিছুটা তাড়াহুড়ো করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধি বা মাজার কমিটির সাথে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। এটি ৬০০ থেকে ৭০০ বছরের পুরোনো একটি ট্র্যাডিশন। তবে মাজারের হিসাব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে জনগণের যে প্রত্যাশা রয়েছে, তার সঙ্গে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই।” তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং সিলেটের সব সংসদ সদস্যও এ ব্যাপারে একমত।
মাজার ইস্যু ছাড়াও মন্ত্রী প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ে বেশ কিছু আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, “আগামী মাস থেকে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের ইতিবাচক ফলাফল মানুষ চোখে দেখতে পাবে। জুলাইয়ের মধ্যে মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ে বড় ধরনের সুখবর আসতে পারে।” তিনি জানান, মালয়েশিয়া সফরটি অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার ফলে জনশক্তি রপ্তানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। আগামী জুলাই মাসের মধ্যেই মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললে দেশের রেমিট্যান্স আয় বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার ($) বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসীদের সেবার মান উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানান, প্রবাসীদের হয়রানি কমাতে এবং তাদের যাত্রা সহজ করতে বিমানবন্দরে বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বয়োজ্যেষ্ঠ, অসুস্থ এবং বিশেষ সহায়তাপ্রার্থী যাত্রীদের জন্য লাগেজ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে। রাতের ফ্লাইটে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং বিমানবন্দরে শিশুদের জন্য একটি আধুনিক ‘কিডস জোন’ স্থাপনের পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে এসব কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
সম্প্রতি কাতারে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত সিলেটের পাঁচ প্রবাসী যুবকের বিষয়েও মন্ত্রী কথা বলেন। তিনি জানান, সরকার এই ঘটনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দেখছে। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে আনা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, তাই তাদের যেকোনো বিপদে সরকার পাশে থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন।
বিমানবন্দরে মন্ত্রীর সঙ্গে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মশিউর রহমান, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব দেবজিৎ সিনহা, শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব শামসুল ইসলাম এবং সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রীর এই সফর ও মাজার নিয়ে সরকারের অবস্থান সিলেটের সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হওয়া অনেক বিভ্রান্তি দূর করতে সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে।














