দীঘিনালার দুর্গম পাহাড়ে ফের রক্তপাত: প্রতিপক্ষের গুলিতে ইউপিডিএফ কর্মী নিহত

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ি জনপদগুলো এমনিতেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে রাজনৈতিক সংঘাত আর রক্তপাতের ভয়ংকর সব গল্প। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রেষারেষি আর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পাহাড়ে আবারও ঝরল তাজা রক্ত। এবার খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বাবুছড়া ইউনিয়নের অত্যন্ত দুর্গম একটি এলাকা মুড়োপাড়ায় প্রতিপক্ষের সশস্ত্র হামলায় এক ইউপিডিএফ (প্রসিত) কর্মী নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। বুধবার, ২৪ জুন ভরদুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটা এই হত্যাকাণ্ডের পর পুরো বাবুছড়া ইউনিয়ন জুড়ে এখন চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছেন না।

স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে বাবুছড়া ইউনিয়নের মুড়োপাড়া চৌমুহনী রাস্তার মোড় এলাকায় এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। নিহত ওই ব্যক্তির নাম সুজন চাকমা। তার বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর। তিনি দীঘিনালা উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রামের বিনন্দ চাকমার ছেলে এবং এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফের (প্রসিত বিকাশ খীসা সমর্থিত) একজন সক্রিয় ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন একটি হত্যাকাণ্ডের পর পাহাড়ি এলাকার সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর ইউপিডিএফের (প্রসিত) দীঘিনালা ইউনিটের সংগঠক সজীব চাকমা সংবাদমাধ্যমের কাছে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জনসংহতি সমিতিকে বা জেএসএস (সন্তু লারমা সমর্থিত) দায়ী করেছেন। সজীব চাকমা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে দাবি করেন, বুধবার দুপুরে সুজন চাকমা মুড়োপাড়া চৌমুহনী রাস্তার মোড়ে একটি ছোট চায়ের দোকানে বসে আরও কয়েকজন কর্মীর সাথে সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে খুব সাধারণ আলোচনা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ৫ থেকে ৭ জনের একটি অজ্ঞাত সশস্ত্র দল হঠাৎ করেই সেখানে এসে হাজির হয়। তারা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুজন চাকমাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে একাধিক গুলি চালায়।

গুলির বিকট শব্দে ওই এলাকার সাধারণ মানুষ ও দোকানদাররা প্রাণভয়ে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি শুরু করেন। অস্ত্রধারীরা তাদের মিশন সফল করার পর খুব দ্রুত পাহাড়ি জঙ্গলের পথ ধরে পালিয়ে যায়। এদিকে বুকে ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে সুজন চাকমা ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার কোনো সুযোগই কেউ পায়নি। তবে ইউপিডিএফের এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জেএসএস (সন্তু) পক্ষের কোনো নেতার বা মুখপাত্রের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি। পাহাড়ে এ ধরনের সংঘাতের পর সাধারণত প্রতিপক্ষ দলগুলো অভিযোগ অস্বীকার করে থাকে বা চুপ থাকে।

পাহাড়ের রাজনীতিতে এমন বন্দুকযুদ্ধ ও গুপ্তহত্যা কোনো নতুন ঘটনা নয়। সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এই আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা ক্ষমতার লড়াই ও চাঁদাবাজির কারণে পাহাড়ে প্রায়ই এমন রক্তপাত ঘটে। পাহাড়ি এই দুর্গম এলাকাগুলোতে বিভিন্ন দল সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করে। এক একটি দল প্রতি বছর হয়তো কয়েক লাখ ডলার ($) বা কোটি কোটি টাকা শুধু এই চাঁদাবাজির মাধ্যমেই সংগ্রহ করে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার ভাগবাটোয়ারা এবং নির্দিষ্ট এলাকায় নিজেদের ১০০% একক নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য ধরে রাখতেই মূলত তারা একে অপরের ওপর এমন সশস্ত্র হামলা চালায়। এই নোংরা লড়াইয়ের বলি হতে হয় সুজন চাকমার মতো সাধারণ মাঠপর্যায়ের কর্মীদের।

হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই দীঘিনালা থানা পুলিশের একটি বড় দল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যান্য সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হন। দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তারা মুড়োপাড়া এলাকায় পৌঁছান। দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে এবং সুজন চাকমার রক্তাক্ত মরদেহটি উদ্ধার করে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলেই বোঝা যাবে ঠিক কতগুলো গুলি তার শরীরে লেগেছিল।

বর্তমানে ওই এলাকায় যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল অন্তত ৫০% বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে এবং তাদের গ্রেপ্তার করতে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। তবে পাহাড়ি এলাকায় এমন ঘটনার পর সাক্ষীরা সাধারণত ভয়ে পুলিশের কাছে মুখ খুলতে চান না, যার কারণে প্রকৃত অপরাধীদের ধরা পুলিশের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং সুশীল সমাজ এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সরকার ও প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে সাধারণ মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পা

বিচার বিভাগ-Judiciary

সম্পর্কিত নিবন্ধ