গাজায় ইসরায়েলের শিশু হত্যা মানবতাবিরোধী অপরাধ: জাতিসংঘের তদন্তে ভয়াবহ চিত্র

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল সরকার ও তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী যেভাবে সাধারণ ও নিরীহ শিশুদের নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, তা স্পষ্টতই জাতিগত নিধন, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের অংশ। শুধু গাজা নয়, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ঠিক একই ধরনের ভয়ংকর অপরাধ সংঘটিত করা হচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন কমিশনের দীর্ঘ ও গভীর তদন্তে এমন হাড়হিম করা তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার এই তদন্ত কমিশন তাদের এই চাঞ্চল্যকর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি বিশ্ববাসীর সামনে প্রকাশ করেছে।

গত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় একটানা ও নির্বিচার সামরিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। তখন থেকে গাজার ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো নৃশংসতা ও বর্বরতা নিয়েই মূলত এই আন্তর্জাতিক তদন্তটি পরিচালনা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসেও এই কমিশন তাদের আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ের বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল।

জাতিসংঘের প্রকাশিত এই নতুন তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলেছেন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তা শ্রীনিভাসান মুরালিধর। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের একেবারে নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে এবং হত্যা করা হচ্ছে। এমনকি ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। তিনি বলেন, এই ধারাবাহিক হত্যাযজ্ঞ এটাই ১০০% প্রমাণ করছে যে, গাজায় বসবাসরত ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার জন্য ইসরায়েল সরকার ও তার সামরিক বাহিনীর একটি পরিষ্কার জাতিগত নিধনের অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য রয়েছে।

তবে প্রত্যাশা অনুযায়ী, বরাবরের মতোই এবারের প্রতিবেদনকেও সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের ইসরায়েলি মিশন একটি কড়া বিবৃতিতে বলেছে, এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো জাতিসংঘের এই কমিশন একটি ‘মানহানিকর অপপ্রচারমূলক’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ইসরায়েল এই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ ‘ভুয়া’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। উল্টো তারা জাতিসংঘের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছে, এই প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের চালানো ‘নৃশংসতা’ ও অপরাধগুলোকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে উঠে আসা পরিসংখ্যান যে কাউকে শিহরিত করবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে গাজায় হওয়া যেকোনো বড় সংঘাতের চেয়ে এবারের সংঘাতে শিশুমৃত্যুর হার অনেক বেশি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ জন নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এটি গাজায় সংঘটিত মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৩০%। ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

প্রতিবেদনে অতীতের সংঘাতের একটি তুলনামূলক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, ২০০৮ থেকে ২০০৯ সাল এবং ২০১৪ সালে গাজায় হওয়া সংঘাতে নিহত ফিলিস্তিনিদের প্রায় ২৪% ছিল শিশু। এবার এই হার ৩০% এ পৌঁছানোর কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার ইসরায়েল অত্যন্ত ভারী গোলা-বারুদ এবং বিস্তৃত এলাকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, এমন ভয়ংকর সব অস্ত্রের বেপরোয়া ব্যবহার করেছে। গাজায় হামলার পাশাপাশি ইসরায়েলের নৃশংসতার কারণে ফিলিস্তিনিরা বারবার নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। উপত্যকাটিতে ওষুধ, খাবার ও ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের ওপরও ইসরায়েল কঠোর অবরোধ দিয়ে রেখেছে। এর ফলে হাজার হাজার শিশুকে দিনের পর দিন অনাহারে থাকতে হয়েছে, যা তাদের স্বাস্থ্য ও শারীরিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

শুধু গাজা নয়, পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলের এই নৃশংসতা সমান তালে চলছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এছাড়া এসব অঞ্চলে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো গণগ্রেপ্তার ও আটক অভিযানের সময় শিশুদের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়, তার অকাট্য প্রমাণও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মতো ঘটনাও রয়েছে। তদন্ত কমিশন বলেছে, ফিলিস্তিনি শিশুরা, বিশেষ করে ছেলেরা ইসরায়েলি কারাগারে আটক অবস্থায় ‘নিয়মিত ও পদ্ধতিগতভাবে’ চরম দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছে। শিশুদের ওপর এসব নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক কর্মকাণ্ড সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন এই প্রতিবেদনের পর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ