নেত্রকোনায় মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনে ইয়াবা পাচার, ৭ হাজার পিসসহ আটক ২

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং সমাজকে কলুষমুক্ত করতে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে তরুণদের মাঝে ইয়াবার মতো ভয়ংকর মাদকের বিস্তার ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন এখন জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় নেত্রকোনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এক বিশাল ও সাহসী অভিযান চালিয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সদর উপজেলার চল্লিশা ইউনিয়নের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় একটি মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা ৭ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুই চিহ্নিত ও কুখ্যাত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করেছে তারা। পুলিশের এই অভাবনীয় সফলতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।

আটককৃত দুই মাদক কারবারির পুরো পরিচয় ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে নেত্রকোনা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এরা হলো মো. সোহেল মিয়া এবং মো. সজীব। সোহেলের পিতার নাম মৃত মোফাজ্জল হোসেন এবং সজীবের পিতার নাম খাইরুল ইসলাম। এই দুই আসামিরই গ্রামের বাড়ি বারহাট্টা উপজেলার চিরাম ইউনিয়নের চিরাম এলাকায়। তারা দুজন মিলে একটি শক্তিশালী ও সংঘবদ্ধ চক্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় অত্যন্ত গোপনে এই মরণনেশা ইয়াবার অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষ তাদের এই ব্যবসার কথা জানলেও, তাদের ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পেত না। তারা শুধু নিজেরাই এই অবৈধ ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিল না, বরং এলাকার অনেক নিরীহ তরুণকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এই অন্ধকার পথে টেনে এনেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনার দিন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে একটি অত্যন্ত গোপন ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ আসে। তারা জানতে পারেন যে, একটি মোটরসাইকেলে করে মাদকের একটি বিশাল চালান রাজেন্দ্রপুর এলাকা পার হয়ে অন্য কোনো জেলায় যাবে। এই সুনির্দিষ্ট খবর পাওয়ার পরপরই ডিএনসির একটি চৌকস দল রাজেন্দ্রপুর এলাকায় একটি অস্থায়ী চেকপোস্ট বসায়। তারা ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়া সন্দেহভাজন সব যানবাহন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তল্লাশি করতে শুরু করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই দুই মাদক কারবারি মোটরসাইকেলে করে চেকপোস্টের কাছাকাছি পৌঁছালে ডিএনসি সদস্যদের সন্দেহ হয়। তারা মোটরসাইকেলটি থামানোর সংকেত দেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই দুই ব্যক্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক থাকার ভান করে এবং তাদের কাছে কিছু নেই বলে দাবি করে। কিন্তু ডিএনসি সদস্যদের সন্দেহ দূর না হওয়ায় তারা পুরো মোটরসাইকেলটি তন্নতন্ন করে খুঁজতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের ভেতরে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা বেশ কয়েকটি প্যাকেট আবিষ্কার করেন। প্যাকেটগুলো খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ৭ হাজার পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট। অপরাধীরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে ইঞ্জিনের মতো গরম ও ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় মাদক লুকিয়ে রাখার যে অভিনব কৌশল ব্যবহার করেছে, তা দেখে ডিএনসি সদস্যরাও রীতিমতো অবাক হয়ে যান।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হক এই সফল অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে জানান। তিনি নিশ্চিত করেন যে, উদ্ধার করা ৭ হাজার পিস ইয়াবার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৮ লাখ টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রার হিসাবে এই টাকার পরিমাণ প্রায় ২৪,০০০$ (ডলার) এর সমান। এত বিপুল পরিমাণ টাকার মাদক সাধারণত কোনো বড় গডফাদার ছাড়া পাচার করা সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, ইয়াবার পাশাপাশি পাচারকারীদের কাছ থেকে তাদের ব্যবহৃত ৩টি স্মার্টফোন এবং মাদক পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত সেই মোটরসাইকেলটিও জব্দ করা হয়েছে। এই মোবাইল ফোনগুলো চেক করলে তাদের চক্রের অন্য সদস্যদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য মতে, দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। আন্তর্জাতিক কালো বাজারে খুব কম দামে তৈরি হওয়া একেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট তারা সাধারণ তরুণদের কাছে ২থেকে৩(ডলার) বা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে। এই ব্যবসায় তারা প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত অবৈধ মুনাফা লাভ করে থাকে।

মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

সহকারী পরিচালক মো. নাজমুল হক জানান, গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল ও সজীবের বিরুদ্ধে নেত্রকোনা মডেল থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের কঠোর ধারায় একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইবে, যাতে এই ২৮ লাখ টাকার ইয়াবার মূল চালান কোথা থেকে এসেছে এবং কারা এর আসল সরবরাহকারী বা গডফাদার, সেই প্রকৃত তথ্য বের করে আনা যায়। নেত্রকোনা জেলাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষও যদি ভয় না পেয়ে প্রশাসনকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে, তবে সমাজ থেকে এই মরণব্যাধি খুব দ্রুতই চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ