শৈলকুপায় ইজিবাইক চালককে কুপিয়ে গাড়ি ছিনতাই, এলাকায় চরম আতঙ্ক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় রাতের অন্ধকারে এক ভয়ংকর ও চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। যাত্রীর ছদ্মবেশে ওঠা একদল সশস্ত্র ছিনতাইকারী এক নিরীহ ইজিবাইক চালককে নির্মমভাবে কুপিয়ে জখম করে তার উপার্জনের একমাত্র সম্বল ইজিবাইকটি ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। এই বর্বরোচিত ঘটনাটি ঘটেছে শৈলকুপা থানার ২ নং মির্জাপুর ইউনিয়নের আলমডাঙ্গা বাজার থেকে বড় বিলগামী অন্ধকার ও নির্জন রাস্তায়। আজ রাত ঠিক ৯টা ৩০ মিনিটের দিকে এই ঘটনা ঘটে। সাধারণ একজন শ্রমজীবী মানুষের ওপর এমন নৃশংস হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই পুরো মির্জাপুর ইউনিয়ন ও এর আশপাশের গ্রামগুলোতে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।

আহত ওই ইজিবাইক চালকের নাম ও বিস্তারিত পরিচয় স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন। তার বাড়ি শৈলকুপার শ্রীরামপুর গ্রামে। তিনি অত্যন্ত গরিব পরিবারের সন্তান এবং অনেক কষ্টে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এই ইজিবাইকটি কিনেছিলেন। সারাদিন ইজিবাইক চালিয়ে তিনি যে টাকা আয় করতেন, তা দিয়েই তার পরিবারের সবার মুখের অন্ন জুটত। ঘটনার রাতে তিনি আলমডাঙ্গা বাজার থেকে কয়েকজন যাত্রীকে নিয়ে বড় বিলের দিকে যাচ্ছিলেন। বাজারের আলো ছাড়িয়ে ইজিবাইকটি যখন বড় বিল রোডের একটি নির্জন ও অন্ধকার জায়গায় পৌঁছায়, ঠিক তখনই যাত্রীর ছদ্মবেশে থাকা ওই ছিনতাইকারীরা তাদের আসল রূপ প্রকাশ করে।

ছিনতাইকারীরা প্রথমে ইজিবাইকটি থামানোর নির্দেশ দেয়। চালক বাধা দিলে বা চিৎকার করার চেষ্টা করলে তারা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো অস্ত্র ও রামদা দিয়ে চালকের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা চালকের হাত ও শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। চালক আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও সশস্ত্র এই চক্রের সামনে তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে চালক যখন নিস্তেজ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন, তখন ছিনতাইকারীরা তার উপার্জনের শেষ সম্বল ইজিবাইকটি নিয়ে রাতের অন্ধকারের মধ্যে দ্রুত পালিয়ে যায়। একটি নতুন ইজিবাইকের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১,৫০০থেকে২,০০০(ডলার) বা দেড় থেকে দুই লাখ টাকার কাছাকাছি। গরিব ওই চালকের পক্ষে নতুন করে আর একটি ইজিবাইক কেনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

রাস্তায় পড়ে থাকা রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু চালককে পরে ওই পথ দিয়ে যাওয়া কয়েকজন স্থানীয় মানুষ দেখতে পান। তারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। চালকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। খবর পেয়ে চালকের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে ছুটে আসেন এবং কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির এমন করুণ অবস্থা এবং শেষ সম্বল হারিয়ে তারা এখন রীতিমতো পথে বসার উপক্রম হয়েছেন। এনজিওর ঋণের কিস্তি কীভাবে শোধ করবেন, সেই চিন্তায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

এই ঘটনার পর স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ইজিবাইক চালকদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, আলমডাঙ্গা বাজার থেকে বড় বিল রোডটি রাতের বেলা অত্যন্ত নির্জন থাকে এবং সেখানে কোনো ধরনের আলোর ব্যবস্থা নেই। এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই ছিনতাইকারীরা প্রায়ই এই রাস্তায় ওঁত পেতে থাকে। এর আগেও এই এলাকায় এমন ছোটখাটো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু চালককে এভাবে নির্মমভাবে কুপিয়ে গাড়ি ছিনতাই করার ঘটনা এটিই প্রথম। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সন্ধ্যার পর এই রাস্তায় পুলিশের কোনো টহল থাকে না বললেই চলে, যার ফলে অপরাধীরা এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশে বর্তমানে ইজিবাইক, অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল ছিনতাইকারী চক্রের দৌরাত্ম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি বা ছিনতাই হওয়া এসব যানের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% আর কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয় না। অপরাধীরা এগুলো ছিনতাই করার পর খুব দ্রুত এর যন্ত্রাংশ খুলে আলাদা করে ফেলে অথবা অন্য কোনো জেলায় নিয়ে অর্ধেক দামে বিক্রি করে দেয়। অনেক সময় এই ছিনতাই করা টাকা দিয়ে তারা মাদক কেনে। তাই এই ধরনের চক্রকে শুরুতেই শক্ত হাতে দমন করা না গেলে সমাজের শান্তিশৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

খবর পেয়ে শৈলকুপা থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা এই ছিনতাই চক্রটিকে ধরতে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। আশপাশের বাজারের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পুলিশ স্থানীয় ইজিবাইক চালকদের রাতের বেলা নির্জন রাস্তায় অপরিচিত যাত্রী তোলার ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন পুলিশের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছেন, তারা যেন দ্রুত এই ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করে চালকের হারানো ইজিবাইকটি উদ্ধার করে দেয় এবং রাতে ওই রাস্তায় পুলিশি টহল অন্তত ১০০% বৃদ্ধি করে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ