মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে এবং সমাজকে কলুষমুক্ত করতে দেশজুড়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাও এর বাইরে নয়। এই উপজেলার তরুণ সমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পুলিশ বেশ কিছুদিন ধরে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শৈলকুপা থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের যৌথ ও সাহসী অভিযানে আলাদা দুটি স্থান থেকে দুই চিহ্নিত মাদক কারবারিকে হাতেনাতে আটক করা হয়। আটকের পর একজনকে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে কারাদণ্ড ও জরিমানা প্রদান করা হয়েছে।
প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় শৈলকুপা গরুর হাট এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একটি চৌকস দল ওই এলাকায় হানা দিয়ে মো. আল ইমরান নামের ২৪ বছর বয়সী এক তরুণ মাদক কারবারিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ তার শরীর তল্লাশি করে অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা ২০ পিস গোলাপি রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে। ইমরানের পিতার নাম মো. আমিরুল ইসলাম সুরুজ এবং তার গ্রামের বাড়ি শৈলকুপা থানার হাবিবপুর এলাকায়। মাত্র ২৪ বছর বয়সে একজন তরুণের এমন জঘন্য মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি এলাকার সাধারণ মানুষকে রীতিমতো অবাক ও হতাশ করেছে। এই বয়সে তার কোনো ভালো পেশায় বা পড়াশোনায় যুক্ত থাকার কথা, কিন্তু সে টাকার লোভে জড়িয়ে পড়েছে এই মরণনেশার ব্যবসায়।
দ্বিতীয় অভিযানটি ছিল আরও বেশি চাঞ্চল্যকর এবং সফল। শৈলকুপার বড়দা এলাকা থেকে মোহাম্মদ ইমরান হোসেন নামের ৩৯ বছর বয়সী আরেক মাদক কারবারিকে ইয়াবাসহ হাতেনাতে আটক করে পুলিশ। তার পিতার নাম মৃত আক্কাস আলী। ইমরান দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় অত্যন্ত গোপনে এই মরণনেশা ইয়াবার অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষ তার এই ব্যবসার কথা জানলেও, তার ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পেত না। সে শুধু নিজেই এই অবৈধ ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিল না, বরং এলাকার অনেক নিরীহ তরুণকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে এই অন্ধকার পথে টেনে এনেছে।
ইমরান হোসেনকে আটকের পরপরই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে একটি মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ইমরান নিজের অপরাধ স্বীকার করায় এবং হাতেনাতে প্রমাণ মেলায়, ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ইয়াবা রাখার মতো গুরুতর অপরাধের দায়ে সরাসরি ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। সাধারণত দীর্ঘ মেয়াদি আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায়, কিন্তু মোবাইল কোর্টের এই তাৎক্ষণিক সাজার ফলে অপরাধীদের মনে এখন বেশ ভয় ঢুকেছে। তাকে সরাসরি ১ বছরের সাজা দেওয়ায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মনে গভীর স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বর্তমানে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদক প্রবেশ করে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সমাজবিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্য মতে, দেশের গ্রামগঞ্জে ঘটা চুরি, ছিনতাই, মারামারি বা কিশোর অপরাধের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% ঘটনার পেছনেই এই মাদকের সরাসরি প্রভাব রয়েছে। তরুণরা একবার ইয়াবার মতো ভয়ংকর নেশায় জড়ালে তাদের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। মাদক কারবারিরা মূলত নিজেদের পকেট ভারী করতে এই সমাজকে ধ্বংস করছে। আন্তর্জাতিক কালো বাজারে খুব কম দামে তৈরি হওয়া একেকটি ইয়াবা ট্যাবলেট তারা সাধারণ তরুণদের কাছে ২থেকে৩(ডলার) বা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে। এই ব্যবসায় তারা প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% পর্যন্ত অবৈধ মুনাফা লাভ করে থাকে।
মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক সচ্ছল পরিবারও আজ আর্থিকভাবে পথে বসছে। একজন মাদকাসক্ত সন্তানকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে বা রিহ্যাবে পাঠাতে একটি পরিবারকে অনেক সময় ৫০০থেকে১০০০ডলার বা ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মতো বিশাল অঙ্ক খরচ করতে হয়। গ্রামের সাধারণ কৃষক, দিনমজুর বা মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসার খরচ মেটানো ১০০% অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম হতাশা ও কান্নার মধ্যে দিন পার করে।
শৈলকুপায় একদিনে এই দুজনের সাজা ও আটকের ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষও যদি ভয় না পেয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে, তবে সমাজ থেকে এই মরণব্যাধি খুব দ্রুতই চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।














