এইচএসসিতে অভিন্ন প্রশ্নপত্র: বৈষম্য কমার আশার পাশাপাশি ফাঁসের বড় ঝুঁকি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় বৈষম্য চলে আসছিল। সারা দেশে একই বই ও একই পাঠ্যক্রম পড়ানো হলেও, পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড আলাদা আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করত। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যেত। অবশেষে এই দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে সরকার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন থেকে দেশের সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র বা একটিমাত্র প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, একই দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তিনি উন্নত বিশ্বের ‘ও’ লেভেল এবং ‘এ’ লেভেল পরীক্ষার উদাহরণ টেনে বলেছেন, সেখানেও একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়।

শিক্ষামন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত প্রথম দর্শনে অত্যন্ত যৌক্তিক ও আধুনিক বলে মনে হয়। দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, কোনো শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্ন তুলনামূলক সহজ হওয়ায় সেখানে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। আবার অন্য কোনো বোর্ডে কঠিন প্রশ্নের কারণে শিক্ষার্থীরা আশানুরূপ ফল করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, কয়েক বছর আগে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসি ইংরেজি বিষয়ে প্রায় ৩৮% শিক্ষার্থী ফেল করেছিল, অথচ একই সময়ে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ছিল প্রায় ৭০%। সিলেবাস একই হওয়ার পরও এমন বিশাল পার্থক্য শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সত্যিই উদ্বেগজনক। এই বৈষম্যের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সময়। মেডিকেল বা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বোর্ডের শিক্ষার্থীদের একই মানদণ্ডে বিচার করা হয়, যা কঠিন প্রশ্ন পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের অবিচার। অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালু হলে এই আঞ্চলিক বৈষম্য অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে এই ভালো উদ্যোগটির পাশাপাশি কিছু বড় চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কার জায়গাও রয়েছে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো প্রশ্নপত্র ফাঁস। ২০১৮ সালেও সরকার দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু তখন প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি এতই বেড়ে যায় যে, কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। বাস্তবতা হলো, যখন একটি প্রশ্নপত্র সারা দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য তৈরি হয়, তখন সেই একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে ক্ষতির পরিমাণও বহুগুণ বেড়ে যায়। আলাদা বোর্ডের ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন ফাঁস হলে তা শুধু একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে, কিন্তু অভিন্ন প্রশ্নপত্রের ক্ষেত্রে তা মুহূর্তের মধ্যেই একটি বিশাল জাতীয় সংকটে পরিণত হতে পারে।

আমাদের দেশের অতীত অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে সরকারি চাকরি ও নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে বহুবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বড় বড় অভিযোগ সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে অনেকবার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে মূল প্রশ্নপত্র, গাইড বই এবং ফটোকপি মেশিন উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমান যুগে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই কোনো তথ্য সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। তাই অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থা চালুর আগে সরকারকে এর নিরাপত্তাব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অন্তত ১০০% শক্তিশালী করতে হবে।

প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ছাপানো, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রতিটি স্তরে কড়া ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। প্রশ্নপত্র বহনকারী গাড়িগুলোতে জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া পরীক্ষার আগে ও চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সার্বক্ষণিক নজরে রাখার জন্য একটি শক্তিশালী সাইবার মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই সম্ভাব্য প্রশ্নপত্র ফাঁস বা গুজব দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। সবচেয়ে জরুরি হলো, যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা।

শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতির বিষয়টিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা সাধারণত বছরের শুরু থেকেই নিজ নিজ বোর্ডের আগের প্রশ্নপত্র ও ধরন দেখে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। শিক্ষকরাও সে অনুযায়ী পড়ান। তাই পরীক্ষার খুব কাছাকাছি সময়ে এমন বড় একটি পরিবর্তনের ঘোষণা অনেক শিক্ষার্থীর মনে অযথাই উদ্বেগ ও ভয় তৈরি করতে পারে। এই সিদ্ধান্তটি যদি আরও আগে থেকে বা আগামী শিক্ষাবর্ষের নতুন ব্যাচ থেকে কার্যকর করা হতো, তবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিজেদের ভালোভাবে প্রস্তুত করার পর্যাপ্ত সুযোগ পেতেন।

তবে আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাবলিক পরীক্ষার নিরাপত্তাব্যবস্থায় বেশ ইতিবাচক উন্নতি দেখা গেছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষাও বেশ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বড় কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর শোনা যায়নি। অভিন্ন প্রশ্নপত্রের এই উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থায় সমতা ও স্বচ্ছতা আনার একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এর চূড়ান্ত সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারের সঠিক প্রস্তুতি এবং প্রশ্নপত্রের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর। শিক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো শিক্ষার্থী, তাই যেকোনো পরিবর্তনের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ন্যায্য ও চিন্তামুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা

সম্পর্কিত নিবন্ধ