শৈলকুপায় প্রশাসন ও পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: মাদক ও মারামারির অপরাধে ৪ জনের কারাদণ্ড

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলাকে অপরাধমুক্ত করতে এবং সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। গত কয়েক দিনে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারি, মাদক সেবনকারী এবং মারামারির সাথে যুক্ত অপরাধীদের হাতেনাতে আটক করা হয়েছে। এসব অপরাধীকে আটক করার পরপরই ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্ট বসিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। প্রশাসনের এই ত্বরিত পদক্ষেপের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে এখন বেশ স্বস্তি বিরাজ করছে।

প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় শৈলকুপার কচুয়া আদিবাসী পাড়ায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওয়ান বাবু সরকার নামের ৩২ বছর বয়সী এক যুবককে হাতেনাতে আটক করে। তার পিতার নাম রঞ্জিত সরকার। পুলিশের তল্লাশিতে তার কাছ থেকে এক পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়। আটকের পরপরই সেখানে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বাবু সরকারকে সরাসরি ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা জরিমানা প্রদান করেন। মাদক সেবন ও বিস্তারের কারণে এলাকার যুবসমাজ যেভাবে ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছিল, এই শাস্তির ফলে তা কিছুটা হলেও কমবে বলে স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেছেন।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদে, যা ছিল একটি মারামারির ঘটনা। জমিজমা সংক্রান্ত একটি পুরোনো বিরোধ মেটানোর জন্য গ্রাম্য আদালতে হাজিরার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু গ্রাম্য আদালতে হাজিরার দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চরম কথা-কাটাকাটি শুরু হয়, যা একপর্যায়ে হাতাহাতি ও বড় ধরনের মারামারিতে রূপ নেয়। এই ঘটনায় তৌহিদ মিয়া ওরফে বাবু নামের ৪৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তার পিতার নাম মৃত আবুল কাশেম মিয়া এবং তার বাড়ি কাচেরকোল গ্রামে। ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে এমন বিশৃঙ্খলা তৈরি করার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ২৫ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেন। গ্রাম্য আদালত মূলত মানুষের সমস্যা সহজে সমাধানের জন্য তৈরি হয়েছে, সেখানে এমন মারামারি সত্যিই অনাকাঙ্ক্ষিত।

তৃতীয় অভিযানটি ছিল বেশ চাঞ্চল্যকর। কারণ, এবার পুলিশের জালে ধরা পড়েছে মাত্র ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর। লাঙ্গলবাধ পুলিশ ক্যাম্পের এসআই মো. আনিছুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল গত ২০ জুন রাত পৌনে ৫টার দিকে (১৬.৪৫ ঘটিকা) ৮নং ধলহরাচন্দ্র ইউনিয়নে এই অভিযান চালায়। নতুন মালিথিয়া গ্রামের অপু বিশ্বাসের মোটরসাইকেলের গ্যারেজের সামনের পাকা রাস্তা থেকে বাধন বিশ্বাস নামের ওই কিশোরকে আটক করা হয়। তার পিতার নাম প্রেম কুমার বিশ্বাস এবং তার বাড়ি মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানার চিলগাড়ী নতুনপাড়া গ্রামে। পুলিশের তল্লাশিতে তার কাছ থেকে ২০ গ্রাম অবৈধ গাঁজা উদ্ধার করা হয়। এত অল্প বয়সে একজন কিশোরের এমন জঘন্য পেশায় যুক্ত হওয়াটা সমাজের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত। পুলিশ তার বিরুদ্ধে নিয়মিত মাদক মামলা দায়ের করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

চতুর্থ এবং সবচেয়ে বড় শাস্তির ঘটনাটি ঘটে শৈলকুপা থানাধীন ত্রিবেণী এলাকায়। সেখানে সুধী চন্দ্র দাসের মুদি দোকানের সামনে থেকে মুস্তাফিজুর রহমান নামের ২৩ বছর বয়সী এক তরুণকে আটক করা হয়। তার পিতার নাম মো. মমিন মৃধা। পুলিশের তল্লাশিতে তার কাছ থেকে ২ পিস ভয়ংকর ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। ইয়াবার মতো মারাত্মক মাদক সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে, যা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ১০০% ধ্বংস করে দিচ্ছে। আটকের পরপরই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। ইয়াবা রাখার মতো গুরুতর অপরাধের দায়ে মুস্তাফিজুর রহমানকে ১ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়।

আমাদের দেশে মাদকের বিস্তার এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররাও এর শিকার হচ্ছে। একটি ইয়াবা ট্যাবলেট হয়তো বাজারে ২বা৩(ডলার) মূল্যে বিক্রি হয়, কিন্তু এর কারণে একটি পরিবারকে পরে চিকিৎসার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের রিহ্যাব বা পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে গিয়ে আর্থিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।

শৈলকুপায় একদিনে এই চারজনের সাজা ও আটকের ঘটনায় স্থানীয় অভিভাবকরা প্রশাসনকে মন থেকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তারা প্রশাসনের কাছে জোর দাবি করেছেন, এই ধরনের ঝটিকা অভিযান যেন শুধু একদিনের জন্য না হয়, বরং সারা বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে। শৈলকুপাকে একটি সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সাধারণ মানুষও যদি ভয় না পেয়ে পুলিশকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করে, তবে সমাজ থেকে এই মরণব্যাধি খুব দ্রুতই চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ