ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব রক্ষায় শুভেন্দু অধিকারীকে থামানোর আহ্বান বিএনপি এমপির

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সব সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর একটি বিষয়। প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব যেমন আছে, তেমনি কিছু অমীমাংসিত সমস্যাও রয়েছে। এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এসব বক্তব্য বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অন্তরায় বা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য জি এম সিরাজ। তিনি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে শুভেন্দু অধিকারীকে থামাতে সরাসরি ভারত সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে জি এম সিরাজ এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে শুধু শুভেন্দু অধিকারীর সমালোচনাই করেননি, বরং ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে আরও সম্মানজনক করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত থেকে জোর করে লোক ঢোকানো বা ‘পুশ ইন’ বন্ধ করা এবং সীমান্তের ওপারে থাকা মাদকের কারখানাগুলো দ্রুত বন্ধ করার জন্য ভারতের কাছে কঠোর দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ সবসময় ভারতের সঙ্গে একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় এই কথা উল্লেখ করে জি এম সিরাজ স্পিকারের মাধ্যমে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, “মাননীয় স্পিকার, আপনার মাধ্যমে আমি মোদি সরকারকে অত্যন্ত সবিনয়ে একটি আহ্বান জানাচ্ছি। আমি বলতে চাই, আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের চিফ মিনিস্টার বা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বাবুকে দয়া করে থামান। তিনি মাঝেমধ্যেই বাংলাদেশ বিরোধী যেসব উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, তা দুই দেশের সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করছে। তাঁর এই ধরনের বক্তব্য ভারত ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের জন্য একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছেন বলে মন্তব্য করেন জি এম সিরাজ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও আমরা সবাই চাই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকুক। আমরা চাই এই সম্পর্ক যেন ১০০% সম্মানজনক হয় এবং আমরা একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে পারি।

প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝাতে জি এম সিরাজ একটি চমৎকার উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, “আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে দুই বন্ধুর মধ্যে বন্ধুত্ব অনেক সময় ক্ষণস্থায়ী হতে পারে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কও ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, তাদের মধ্যে ডিভোর্স বা ছাড়াছাড়ি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের মতো দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে কখনোই কোনো ডিভোর্স হতে পারে না। কারণ, আমরা কেউ আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তন করতে পারব না। তাই আমাদের একসাথে মিলেমিশে থাকার কোনো বিকল্প নেই।”

সম্প্রতি ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশে এসেছেন। বাংলাদেশে আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটি নিয়েও সংসদে কথা বলেন জি এম সিরাজ। তিনি উল্লেখ করেন, নতুন হাইকমিশনারের কিছু মন্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যে দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ এসব বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করছেন।

ভারতের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে জি এম সিরাজ ভারতের নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয় জয় করার চেষ্টা করুন। তিনি বলেন, “আমরা মন থেকে চাই, ভারতবিরোধিতা অথবা বাংলাদেশবিরোধিতা—এগুলোর চিরতরে অবসান হোক। আমরা একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সহাবস্থান করতে চাই। আর সেই শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে আমার সবিনয় অনুরোধ ভারতের বর্তমান সরকারের প্রতি যে, আপনারা দয়া করে সীমান্তে পুশ ইন বন্ধ করুন এবং মাদকের বিস্তার রোধ করুন।”

সংসদে আলোচনার শেষ পর্যায়ে এসে জি এম সিরাজ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা এবং এর সম্পদ নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ একটি বিশাল সমুদ্র জয় করেছিল এবং সে সময় এই নিয়ে অনেক বেশি প্রচার-প্রচারণাও হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, বিগত সরকারের আমলে ‘প্রভুদের নির্দেশ ছাড়া’ বা বাইরের দেশের ইশারা ছাড়া সেই সমুদ্র থেকে কোনো খনিজ সম্পদ তোলা যায়নি। তবে বর্তমান সরকার অফশোর বিডিং বা সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি বড় ও সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে জানান, এবার এই সম্পদ উত্তোলনের জন্য আর বাইরের কারও কোনো অনুমতির প্রয়োজন হয়নি, বাংলাদেশ তার নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ