মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। চুক্তি সই হওয়ার পরপরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের দীর্ঘদিনের নৌ অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এই অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানায়, ‘প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী’ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং অবরোধ কার্যকরের সব ধরনের মার্কিন তৎপরতা বন্ধ করা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর।
তবে এই শান্তি চুক্তি নিয়ে ইরানের ভেতরেই কিছুটা মতবিরোধ দেখা গেছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রথমবারের মতো এই চুক্তির বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এই চুক্তির বিষয়ে তার ‘ভিন্ন মত’ রয়েছে। খামেনি দাবি করেন, শুরুতে তিনি এই চুক্তির পক্ষে ছিলেন না। তবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আশ্বাসের পর তিনি এতে সম্মতি দেন। তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিতে সই করার জন্য ‘মরিয়া হয়েই’ সব ধরনের প্রভাব খাটিয়েছেন। মোজতবা খামেনির বাবা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক ভয়ংকর হামলায় নিহত হন। বাবার মৃত্যুর পর মার্চ মাসে দায়িত্ব নেন মোজতবা। এরপর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই চুক্তির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, চুক্তির শর্তগুলো পুরোপুরি পূরণ না করা পর্যন্ত ইরান কোনো অর্থ পাবে না বা কোনো নিষেধাজ্ঞা থেকেও ছাড় পাবে না। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরানকে আগে প্রমাণ করতে হবে যে তারা ‘পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলবে এবং নিজেদের আচরণ বদলাবে’। এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো—ইরানকে তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আর কোনো অর্থ বা অস্ত্র দেওয়া চলবে না। ভ্যান্স জানান, চুক্তিটি ইতিমধ্যে কার্যকর হয়েছে এবং এর ফলে পরবর্তী ৬০ দিন আরও আলোচনা চলবে। কারিগরি আলোচনার জন্য তিনি শিগগিরই সুইজারল্যান্ডে যেতে পারেন।
গত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা ছিল। তবে এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান বিবিসিকে জানিয়েছে যে, সুইজারল্যান্ডের সেই অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে। কারণ, চুক্তিটি ইতিমধ্যে দূর থেকেই সই হয়ে গেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী ৬০ দিনের চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা অচিরেই সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসবেন। খামেনির বিবৃতির সরাসরি কোনো জবাব না দিলেও ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি আশা প্রকাশ করেন, লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহসহ ‘সব ফ্রন্টে’ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি ধরে রাখবে।
এই চুক্তির পর ইসরায়েলের ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিলেও তার মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য এই চুক্তির চরম সমালোচনা করেছেন। এর কড়া জবাব দিয়েছেন জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, যারা চুক্তির সমালোচনা করছেন তাদের ‘জেগে ওঠা উচিত এবং বাস্তবতা বোঝা উচিত’। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বে টিকে থাকা আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে এভাবে আক্রমণ করতাম না।’ ভ্যান্স ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের নাম উল্লেখ করে বলেন, “আপনাদের আসল প্রস্তাবটা কী? আপনারা মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ। জাতীয় নিরাপত্তার সব সমস্যা শুধু মানুষ মেরেই সমাধান করা যায় না।”
যুদ্ধবিরতি বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই চুক্তিটি ১৪টি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘সব ফ্রন্টে’ সংঘাতের অবসান, অবরোধ প্রত্যাহার, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা ১০০% নিশ্চিত করা। চুক্তির একটি বড় চমক হলো ইরানের ‘পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের’ জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলার বা ৩০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি। তবে এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। এত বড় চুক্তির পরও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে। হিজবুল্লাহ এই চুক্তির শর্তগুলো মানতে এখনো রাজি হয়নি, যা এই শান্তি প্রক্রিয়াকে কিছুটা হলেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।














