“গোল করে পর্তুগাল যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল।” হিউস্টনে প্রথমার্ধ শেষে ঠিক এই কথাটিই বলেছিলেন ফ্রান্সের সাবেক তারকা স্ট্রাইকার অলিভিয়ের জিরু। তাঁর এই মন্তব্য মোটেও অমূলক ছিল না। পর্তুগালের সেই ‘ঘুম’ বিরতির পর ভাঙলেও, জয়টা আর তাদের কপালে জোটেনি। বরং ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা ডিআর কঙ্গো প্রথমার্ধের অতিরিক্ত সময়ে গোল করে পর্তুগালকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে এবারের বিশ্বকাপের আরেকটি বড় চমক উপহার দিয়েছে।
এই ম্যাচটি হতে পারত ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর একার। কানসাসে লিওনেল মেসি যখন ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৬ নম্বর বিশ্বকাপে খেলার অনন্য রেকর্ড গড়েন, তার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে হিউস্টন স্টেডিয়ামে সেই রেকর্ডে ভাগ বসান পর্তুগিজ সুপারস্টার। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে দলীয় একাদশে সবচেয়ে বেশি বয়সী আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের রেকর্ডও গড়েন ৩৯ বছর বয়সী রোনালদো। কিন্তু মাঠে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল একেবারেই বিবর্ণ। পুরো প্রথমার্ধে তিনি বল ছুঁতে পেরেছেন মাত্র ১৬ বার, আর প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকেছেন মাত্র একবার।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য পর্তুগালের পক্ষেই ছিল। ৫ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের মাথায় বাঁ প্রান্ত থেকে পেদ্রো নেতোর দারুণ এক ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে মিডফিল্ডার জোয়াও নেভেস দলকে এগিয়ে দেন। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে পর্তুগালের চেয়ে ৩৬ ধাপ পিছিয়ে থাকা কঙ্গোর বিপক্ষে এই গোলের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো গোলের বন্যা বয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে হলো উল্টো। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ফরোয়ার্ড ইওয়ান উইসা এবং ওয়েস্ট হামের ডিফেন্ডার অ্যারন ওয়ান-বিসাকাদের নিয়ে গড়া ডিআর কঙ্গো ঘুরে দাঁড়ায় দারুণভাবে।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের ৫ মিনিটে বাঁ প্রান্ত থেকে আসা এক ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে উইসা গোল করে কঙ্গোকে সমতায় ফেরান। এটি ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসের প্রথম গোল। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে এই দলটি ৩ ম্যাচে ১৭ গোল হজম করেছিল, কিন্তু কোনো গোল করতে পারেনি। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে উইসার এই গোল শুধু কঙ্গোকে প্রথম পয়েন্টই এনে দেয়নি, বরং পর্তুগালের মতো পরাশক্তিকে মাটিতে নামিয়ে এনেছে। ধারাভাষ্যকারের ভাষায়, “হিউস্টনে ইতিহাস তৈরি হলো!”
পর্তুগালের আক্রমণভাগ এই ম্যাচে রীতিমতো ধুঁকেছে। ভিতিনিয়া, ব্রুনো ফার্নান্দেজ, পেদ্রো নেতোদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ প্রথমার্ধে শট নিতে পেরেছে মাত্র দুটি, যার মধ্যে পোস্টে ছিল মাত্র একটি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ডিআর কঙ্গো প্রথমার্ধেই ৬টি শট নিয়েছিল, যার দুটি ছিল অন টার্গেট।
বিরতির পর পর্তুগাল কিছুটা গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। রোনালদোকে দেখা যায় সতীর্থ ভিতিনিয়াকে কিছু পরামর্শ দিতে। কিন্তু আক্রমণের ধার বাড়ালেও দ্বিতীয়ার্ধে পর্তুগালের নেওয়া পাঁচটি শটের একটিও লক্ষ্যে ছিল না। অন্যদিকে, ডিআর কঙ্গো নিজেদের রক্ষণভাগ জমাট করে পর্তুগিজদের আটকে রাখে।
ম্যাচের সবচেয়ে বড় হতাশা ছিলেন রোনালদো নিজেই। পুরো ম্যাচে তিনি বল স্পর্শ করতে পেরেছেন মাত্র ২৫ বার, যা তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে অন্তত ৮০ মিনিট খেলা ম্যাচগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এমন বিবর্ণ পারফরম্যান্সের পরও কোচ রবার্তো মার্তিনেজ কেন তাঁকে আগেভাগে তুলে নিলেন না, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।
ডিআর কঙ্গোর এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে দিয়েছে যে ফুটবলে ছোট দল বলে কিছু নেই। বিশ্বকাপের মঞ্চে যে কেউ যেকোনো সময় চমক দেখাতে পারে, আর সেটাই করে দেখাল আফ্রিকার এই দলটি।














