যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত, রোববারই সইয়ের সম্ভাবনা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আকাশ থেকে কালো মেঘ হয়তো এবার সত্যিই কাটতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম অনিশ্চয়তার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারকের খসড়া অবশেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করতে পারে তেহরান ও ওয়াশিংটন। পশ্চিমা একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র বিখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই সুখবরটি নিশ্চিত করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই চুক্তির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকে শেষ মুহূর্তে এখনো কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন আসা সম্ভব। তবে সম্ভাব্য চুক্তির শর্তগুলো দেখলে এটা ১০০% স্পষ্ট যে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে তার দেশ ইরান বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী হয়ে আত্মপ্রকাশ করছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে দাবি করেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই কঠিন যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী হয়েছে।”

চুক্তিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকে মূলত দুটি বড় বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার সব জাহাজের জন্য খুলে দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করে নেবে। এই যুদ্ধ শুরুর প্রধান অজুহাত হিসেবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির যে কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলেছিলেন, সে বিষয়ে চুক্তিতে বলা হয়েছে যে তা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলাদাভাবে সমঝোতা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্রের একজন পদস্থ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এই চুক্তিতে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যগুলো অনেকটাই অর্জিত হচ্ছে এবং এটি সমঝোতা আলোচনাকে ‘খুব, খুব ভালো একটি জায়গায়’ নিয়ে এসেছে।

গত ৮ এপ্রিল দুই দেশের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর সম্প্রতি আবার একে অন্যের ওপর তারা হামলা চালায়। গত বৃহস্পতিবার রাতেও ইরানে কঠোর সামরিক হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিছুক্ষণ বাদেই তিনি আবার বলেন যে, তিনি হামলা চালাতে নিষেধ করেছেন। এর পেছনের কারণ হিসেবে তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি প্রায় প্রস্তুত। এরপরই মূলত এই সমঝোতা স্মারকের বিষয়টি সবার সামনে আসে। মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রায়ান জিনকেও জানিয়েছেন, যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন একটি চুক্তির অনেক কাছাকাছি রয়েছে তেহরান ও ওয়াশিংটন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, স্মারকটিতে দুই পক্ষ সই করলে আগামী ৬০ দিনের জন্য সব ধরনের যুদ্ধ ও হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। এই ৬০ দিনের শান্ত সময়ে চূড়ান্ত ও দীর্ঘমেয়াদি একটি চুক্তির আলোচনা হবে। যদিও এতদিন নানা ইস্যুতে জটিলতার কারণে সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত করার বিষয়টি বারবার আটকে ছিল। তবে অস্ট্রিয়ার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা উল্ফগ্যাং পুসতাই মনে করেন, কোনো সমঝোতা আসলেই হবে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি। কারণ, ইসরায়েল এখনো দক্ষিণ লেবাননে বোমাবর্ষণ ও দখলদারি চালিয়ে যাচ্ছে।

চুক্তিতে ইরান আসলে কী চাইছে? ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে তারা তাদের আগের শর্তগুলো থেকে একচুলও সরে আসেননি। ইরানের সবচেয়ে বড় দাবি হলো, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি ইরানের আশপাশ থেকে সব মার্কিন বাহিনীকে দ্রুত সরিয়ে নিতে হবে। এছাড়া খসড়া সমঝোতা স্মারকে ইরানের তেলের ওপর থেকে সব ধরনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টিও থাকবে। বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের প্রায় কয়েক শ কোটি বা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) দ্রুত ছাড় করার কথাও তোলা হবে। যুদ্ধে ইরানে যে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা সামলে নিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের একটি ক্ষতিপূরণ পরিকল্পনা জমা দিতে হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলে এই চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র। লেবাননে ইসরায়েল এখনো ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী ইল কোহেন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্যগুলো আমলে না নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করলে তারা কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিষয়টি যেন চুক্তিতে কঠোরভাবে রাখা হয়। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, ট্রাম্প যদি তাদের লেবাননে হামলা বন্ধ করতে বলেন, তবে বাধ্য হয়েই তাদের তা মানতে হবে।

ট্রাম্পের জন্য এই চুক্তিটি আসলে একটি ‘মুখরক্ষার’ বড় সুযোগ। এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব নিত্যপণ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে, যা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে তলানিতে নিয়ে গেছে। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন বলে জরিপে দেখা যাচ্ছে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব রোমের শিক্ষক আন্দ্রিয়া দেসি বলেন, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে বের হতে ট্রাম্প এখন আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এবং এই চুক্তিই তাকে দেশের মানুষের কাছে মুখরক্ষা করতে সাহায্য করবে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ