দীর্ঘদিনের পুরোনো ও পরীক্ষিত মিত্র হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইসরায়েলের গোপন গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন এখন চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে[1]। পরিস্থিতি এতটাই খারাপের দিকে গেছে যে, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের এই শীর্ষ মিত্র দেশের কাছ থেকে আসা কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স বা পাল্টা গোয়েন্দা হুমকির মাত্রাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সর্বোচ্চ স্তরে বা ‘ক্রিটিক্যাল’ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক তিনজন কর্মকর্তা এই স্পর্শকাতর তথ্য সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। কর্মকর্তারা জানান, ইরানের সঙ্গে চলমান এই ভয়াবহ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভেতরে-ভেতরে ব্যাপক মতবিরোধ ও উত্তেজনা চলছে। এই উত্তেজনার মাঝেই পেন্টাগনের অত্যন্ত শক্তিশালী ‘ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ)’ এই নতুন ও কড়া ‘পাল্টা গোয়েন্দা সতর্কবার্তা’ জারি করেছে। ডিআইএ তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্কে একটি অভ্যন্তরীণ বার্তা পোস্ট করেছে, যেখানে ইসরায়েলি গোয়েন্দাগিরির হুমকির স্তর বাড়িয়ে ‘সংকটজনক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রধান আশঙ্কা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও অত্যন্ত গোপনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের তথ্য হাতিয়ে নিতে ইসরায়েল বিশেষভাবে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর কড়া নজরদারি চালানোর চেষ্টা করছে। এই উদ্বেগ থেকেই ইসরায়েলকে সর্বোচ্চ স্তরের হুমকিতে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ডিআইএ-এর সাত পৃষ্ঠার ওই মূল্যায়ন নথিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, মানুষের মাধ্যমে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ এবং আধুনিক কারিগরি উপায়ে তথ্য চুরির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সক্ষমতা এখন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি সংকটজনক স্তরে পৌঁছেছে।
তবে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের মতো মিত্র দেশের সরকারি কর্মকর্তা বা কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালায় না। তাদের সব গোয়েন্দা তৎপরতা মূলত শত্রুদের লক্ষ্য করেই পরিচালিত হয়। হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তাও এই খবরটিকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন। কিন্তু পেন্টাগন এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এমন কড়া সতর্কবার্তা ঠিক তখনই এল, যখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহে তাদের মধ্যে হওয়া একটি ফোনালাপে এই চরম উত্তেজনা প্রকাশ পায়। ওই ফোনালাপের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন যে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলেছেন।
গত এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক চুক্তির জোর চেষ্টা করছেন, যাতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের অবসান ঘটানো যায়। কিন্তু নেতানিয়াহু এই যুদ্ধবিরতি না মেনে ইরানের ওপর আবার সামরিক হামলা শুরু করার জন্য ট্রাম্পকে বারবার চাপ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা কমিয়ে আনার জন্য ট্রাম্পের দেওয়া চাপও তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাবেন নাকি সংঘাতের অবসান ঘটাবেন, তা আগে থেকেই জানতে ইসরায়েল গভীর আগ্রহ নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি করছে। এর প্রভাব এতটাই মারাত্মক যে, মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তারা যখন ইসরায়েল সফরে যান, তখন তারা নিজেদের মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপ ব্যবহার না করে অস্থায়ী বা ‘বার্নার ফোন’ ব্যবহার করেন। এমনকি হোটেলের কক্ষে বসে নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত কথা বলতেও তারা এখন ভয় পান।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৮০-এর দশকে জনাথন পোলার্ড নামের এক মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক স্যুটকেসভর্তি অত্যন্ত গোপনীয় নথিপত্র ইসরায়েলের কাছে বিক্রি করে ধরা পড়েছিলেন। সে সময় দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছিল। বর্তমানে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে দুই দেশের সরকার যখন পুরোপুরি একমত হতে পারছে না, ঠিক এমন একটি সংবেদনশীল মুহূর্তে ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তির এই নতুন আশঙ্কা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিশ্বাসকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
















