বরগুনার সাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়ল রহস্যময় যন্ত্র: তদন্তে বাংলাদেশ নৌবাহিনী

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বঙ্গোপসাগরের বুকে প্রতিদিন হাজার হাজার জেলে জীবিকার সন্ধানে ট্রলার নিয়ে জাল ফেলেন। তাদের জালে সাধারণত নানা জাতের সামুদ্রিক মাছ ধরা পড়ে, যা দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) অবদান রাখে। কিন্তু গত রোববার বিকেলে বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেদের জালে এমন এক অদ্ভুত জিনিস উঠে এসেছে, যা দেখে সবাই চমকে গেছেন। মাছের বদলে জালে উঠে এসেছে টর্পেডোর মতো দেখতে সম্পূর্ণ ধাতব ও রহস্যময় এক সামুদ্রিক যান। উদ্ধার হওয়া এই যন্ত্রটি নিয়ে পাথরঘাটা এলাকাসহ পুরো দেশে ব্যাপক কৌতূহল ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার কথা চিন্তা করে পুলিশ দ্রুত যন্ত্রটি নিজেদের হেফাজতে নেয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এই অত্যাধুনিক সামুদ্রিক যানটি এখন বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বরগুনা জেলা পুলিশ আজ মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই হস্তান্তরের তথ্য নিশ্চিত করেছে। বরগুনার পুলিশ সুপার কুদরত-ই-খুদা আজ বেলা পৌনে একটার দিকে গণমাধ্যমকে জানান, তারা খুব সতর্কতার সঙ্গে যানটি নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছেন। পাথরঘাটা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সোহান জেলেদের কাছ থেকে খবর পেয়ে প্রথমেই বস্তুটি সাগরপাড় থেকে উদ্ধার করেন। তিনি আজ দুপুরে জানান, গতকাল সোমবার রাতেই বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কড়া পাহারায় বস্তুটি নিরাপদে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। কোস্টগার্ডের দক্ষিণ জোনের মিডিয়া কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে কোস্টগার্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে, যানটি প্রথমে তাদের কাছেই ছিল। এরপর ফরেনসিক এবং কারিগরি পরীক্ষার জন্য নৌবাহিনীর হাতে দেওয়া হয়। এখন নৌবাহিনী প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।

গত রোববার বিকেলে পাথরঘাটার একটি মাছ ধরার ট্রলার গভীর সাগরে জাল ফেললে এই বিশাল যন্ত্রটি আটকে যায়। জেলেরা প্রথমে ভয় পেলেও পরে সাবধানে এটিকে ট্রলারে তুলে আনেন। যানটি দেখতে একেবারে পানির নিচে চলা স্বয়ংক্রিয় সাবমেরিন বা টর্পেডোর মতো। এর দৈর্ঘ্য প্রায় আট ফুট এবং রং উজ্জ্বল লাল ও হলুদ। এর দুই প্রান্ত গোলাকার এবং পেছনের অংশে পানির নিচে ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য ছোট ফ্যান বা পাখা রয়েছে। ওপরের ঢাকনা খুললে ভেতরে অনেক আধুনিক সরঞ্জাম দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক মডিউল, শক্তিশালী ব্যাটারি ইউনিট, নানা ধরনের সেন্সর এবং অ্যান্টেনার মতো আধুনিক যোগাযোগযন্ত্র। সাধারণত এ ধরনের উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক বেশি থাকে, যা অনেক সময় ৫ লাখ ডলার থেকে শুরু করে ১০ লাখ ডলার ($) পর্যন্ত হতে পারে।

দেশের স্বনামধন্য সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞানীরা ছবি ও বিবরণ দেখে এর পরিচয় সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল আজিজ জানান, প্রাথমিকভাবে এটিকে ‘অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিকেল’ বা সংক্ষেপে ‘এইউভি’ (AUV) বলে মনে হচ্ছে। এটি মূলত পানির নিচে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলকারী এক ধরনের অত্যাধুনিক গবেষণা যান। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো সমুদ্র গবেষণা, পরিবেশের পরিবর্তন নজরদারি, সমুদ্রতলের নিখুঁত মানচিত্র তৈরি এবং সামরিক গোয়েন্দা নজরদারির জন্য এমন যান ব্যবহার করে থাকে। আমাদের দেশে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার খুব একটা দেখা যায় না। অধ্যাপক আজিজ মনে করেন, ছবিতে দেখে যন্ত্রটি সচল বলে মনে হয়নি। হয়তো যান্ত্রিক ত্রুটি বা ব্যাটারির চার্জ শেষ হওয়ার কারণে এটি অন্য কোনো দেশ থেকে স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে আমাদের জলসীমায় ঢুকে পড়েছে।

এ ধরনের যান সাধারণত একটানা দীর্ঘ সময় পানির নিচে থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নানা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। কাজ শেষে এগুলো নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসে অথবা সংগৃহীত তথ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মূল কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, আবহাওয়া সংস্থা, নৌবাহিনী ও তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো নিয়মিত এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সমুদ্রপ্রাণী গবেষক মীর মোহাম্মদ আলীও বিষয়টি নিয়ে নিজের মতামত দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উপকূলে জেলেদের জালে প্রকাশ্যে এমন উচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্র ধরা পড়ার ঘটনা সত্যিই খুব বিরল। যদি এটি আমাদের দেশের কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের না হয়ে থাকে, তবে এটি কীভাবে এবং ঠিক কী উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরের আমাদের জলসীমায় ঢুকল, তা ১০০% নিশ্চিত হওয়া দরকার।

বঙ্গোপসাগর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক সমুদ্রপথ। প্রতি বছর এই পথ দিয়ে শত শত বিলিয়ন ডলারের ($) পণ্য আনা-নেওয়া হয়। তাই এখানে কোনো বিদেশি সামরিক নজরদারি চলছে কি না, তা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এই ঘটনা। মীর মোহাম্মদ আলী জানান, এর আসল পরিচয় বের করা কঠিন হবে না। যন্ত্রটির গায়ে থাকা সিরিয়াল নম্বর, প্রস্তুতকারক কোম্পানির নাম, ভেতরের মেমোরি কার্ডে সংরক্ষিত তথ্য, সেন্সরের ধরন এবং যোগাযোগব্যবস্থার ফরেনসিক বিশ্লেষণ করলে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে এটি কোথা থেকে এসেছে, কত দিন ধরে সাগরের নিচে ছিল এবং কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছিল, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।

আপাতত দেশের সচেতন মানুষ ও গবেষকরা নৌবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিবৃতির অপেক্ষায় আছেন। রহস্যময় এই যানের প্রকৃত পরিচয় জানা গেলে বঙ্গোপসাগরের তলদেশের অনেক অজানা গবেষণার তথ্য যেমন সামনে আসবে, তেমনি আমাদের আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও আরও জোরদার করার সুযোগ তৈরি হবে। একটি সাধারণ মাছ ধরার ট্রলারের জেলেদের জালে আটকে পড়া এই যানটি এখন প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও গভীর তদন্তের অপেক্ষায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ