ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম কি ঋণখেলাপি? সব জল্পনার অবসান ঘটাল বাংলাদেশ ব্যাংক

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। এই ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলম। কিন্তু নতুন এই দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়। ফেসবুকে অনেকেই দাবি করেন, খুরশীদ আলম একজন চিহ্নিত ঋণখেলাপি। একজন ঋণখেলাপি ব্যক্তি কীভাবে দেশের এত বড় একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হতে পারেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদরা নানা প্রশ্ন তোলেন। চারদিকে যখন এমন তীব্র সমালোচনা চলছে, ঠিক তখনই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা এই পুরো বিষয়টির পেছনের সত্য ঘটনা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরেছে।

আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের সামনে এসে এই বিতর্কের পরিষ্কার জবাব দেন। তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেন, মো. খুরশীদ আলম নিজে কোনোভাবেই ঋণখেলাপি নন। তার বিরুদ্ধে অনলাইনে যেসব কথা ছড়ানো হচ্ছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। আরিফ হোসেন খান জানান, খুরশীদ আলমের স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩ কোটি টাকার একটি ঋণ নিয়েছিল। বর্তমান আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে এই ৩ কোটি টাকার মান প্রায় আড়াই লাখ ডলার ($২৫০,০০০)। ব্যবসায়িক লোকসান বা অন্য কোনো কারণে ওই ঋণটি নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করতে না পারায় তা পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে যায়।

স্ত্রীর ঋণখেলাপি হওয়ার প্রভাব স্বামীর চাকরির ওপর পড়বে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ব্যাংকিং আইন ও নিয়ম অনুযায়ী খুরশীদ আলমকে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিহিত করা একদমই সঠিক কাজ নয়। তার স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ওই ব্যাংক থেকে কোনো টাকা ধার নেননি। তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোম্পানি আইন ও নিয়ম অনুযায়ী, স্ত্রীর ঋণখেলাপির কারণে খুরশীদ আলমের ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো ধরনের বাধা নেই। তিনি ১০০% বৈধভাবেই এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেছেন।

এই ঋণখেলাপির বিতর্কের পাশাপাশি খুরশীদ আলমকে ঘিরে বেশ কিছু পুরোনো অভিযোগও নতুন করে সামনে এসেছে। অনেকেই তার অতীতের কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে অনলাইনে নানা লেখালেখি করছেন। এসব বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সাংবাদিকদের সামনে খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, অতীতে খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছিল, সেখানে অনেক ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। সেই ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাকে সে সময় যে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তা মোটেও যথাযথ ছিল না। বিষয়টি পরে সঠিক তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আর এ কারণেই ভুল প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং পরবর্তীতে ডেপুটি গভর্নর হিসেবে সম্মানজনক পদোন্নতি পান।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। আমরা সবাই জানি, দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের প্রায় ২৫% আমানত এই একটি ব্যাংকেই জমা আছে। এই ব্যাংকে দেশের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্ছিত আছে। তাই ব্যাংকের শীর্ষ পদে কে বসছেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগ থাকাটা খুব স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, খুরশীদ আলমকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সব ধরনের নিয়মকানুন মেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার মতো একজন অভিজ্ঞ ব্যাংকার এই বিশাল প্রতিষ্ঠানকে আগামী দিনে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারবেন।

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগের বিষয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থানের কথা আবারও পরিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সম্প্রতি এই নিয়োগ নিয়ে ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে কিছু বিক্ষোভ ও আন্দোলনের খবর পাওয়া গেছে। অনেকেই এই সিদ্ধান্ত বাতিলের জোরালো দাবি জানিয়েছেন। তবে মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান খুব কড়া ভাষায় জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে তাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত একদম সঠিক। তাই বাইরে থেকে কোনো ধরনের আন্দোলন, সমালোচনা বা চাপের মুখে পড়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের এই সিদ্ধান্ত কখনোই পরিবর্তন করবে না। তারা এই নিয়োগের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। তিনি সবাইকে গুজবে কান না দিয়ে ব্যাংকের স্বাভাবিক কাজে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান।

ব্যাংকিং খাত নিয়ে বর্তমানে দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট কাজ করছে। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা লোপাটের খবর সাধারণ মানুষকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। দেশের প্রায় ৪০% মানুষ এখন ব্যাংকে টাকা রাখার আগে অনেক কিছু চিন্তা করেন। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকের মতো একটি শীর্ষ ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়াটা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো লক্ষণ নয়। অনেকেই সামান্য তথ্য পেয়েই যাচাই না করে সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতিবাচক প্রচার চালান।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু অনেক সময় এখানে ছড়ানো ভিত্তিহীন খবর দেশের বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের ক্ষতি করে দেয়। একটি ভুয়া খবরের কারণে গ্রাহকরা ভয় পেয়ে ব্যাংক থেকে তাদের জমানো টাকা তুলে নিতে শুরু করতে পারেন। এতে দেশের পুরো অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। তাই অর্থনীতিবিদরা সবসময় পরামর্শ দেন, ব্যাংকিং খাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে অনলাইনে কোনো কিছু শেয়ার করার আগে আমাদের সবাইকে অন্তত ১০০% নিশ্চিত হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এই বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই দ্রুত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই বিতর্ক কিছুটা হলেও কমে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সম্পর্কিত নিবন্ধ