নতুন সরকার গঠনের মাত্র সাড়ে তিন মাস পার হতে না হতেই দেশের রাজনীতিতে একটি বড় চমক দেখা গেল। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান হঠাৎ করেই নিজের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। আজ সোমবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি মূলত নিজের শারীরিক জটিলতা ও অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন। কিন্তু পাহাড়ের সাধারণ মানুষ ও তার দলের হাজারো নেতা-কর্মী এই কারণ কোনোভাবেই মানতে নারাজ। তারা মনে করছেন, এই অপ্রত্যাশিত পদত্যাগের পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক চাপ বা ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে।
পদত্যাগের খবর পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই রাঙামাটির রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দীপেন দেওয়ানের ক্ষুব্ধ অনুসারীরা রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেন। যান চলাচল বন্ধ করে দিয়ে তারা একটাই দাবি জানান অবিলম্বে এই পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে দীপেন দেওয়ানকে তার নিজ পদে পুনর্বহাল করতে হবে। রাঙামাটি জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান, দীপেন দেওয়ান ১০০% শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। দীর্ঘদিন পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় তার সাথে ঘুরেও কেউ কখনো তাকে দুর্বল বা অসুস্থ হতে দেখেনি। তিনি অভিযোগ করেন, দলের ভেতরের কিছু নেতা প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়ে পাহাড়ে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির পাঁয়তারা করছেন।
প্রায় একই সুরে কথা বলেছেন কাউখালী উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও জেলা কমিটির সদস্য সাজামং মারমা। তিনি দাবি করেন, পদত্যাগপত্রে দেখানো কারণটি পুরোপুরি সাজানো ও ভিত্তিহীন। তিনি শারীরিকভাবে যেমন সুস্থ, মানসিকভাবেও মন্ত্রণালয় চালানোর জন্য সম্পূর্ণ সক্ষম। সাজামং মারমা অভিযোগ করেন, গত ৫ আগস্টের পর থেকে যারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে আড়ালে লালন-পালন করে আসছিল, মূলত তাদের প্রবল চাপের মুখেই দীপেন দেওয়ান সাময়িকভাবে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এটি পাহাড়ের সব সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক ও পেশাগত অতীত বেশ উজ্জ্বল। তিনি একজন সাবেক যুগ্ম জেলা জজ ছিলেন। বিচারকের নিরাপদ চাকরি ছেড়ে প্রথমবারের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েই তিনি সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করার দারুণ রেকর্ড গড়েন। তার পরিবারও রাজনীতির সাথে যুক্ত। তার বাবা সুবিমল দেওয়ান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপজাতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এবার বিএনপি সরকার গঠন করলে দীপেন দেওয়ানকে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী করা হয়।
পাহাড়ের রাজনীতি সব সময়ই বেশ জটিল ও অত্যন্ত সংবেদনশীল। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—এই তিনটি সংসদীয় আসনেই এবার বিএনপির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। বান্দরবান থেকে সাচিংপ্রু জেরী এবং খাগড়াছড়ি থেকে ওয়াদুদ ভূঁইয়া সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দলের ভেতরে অতীতে নানা মতবিরোধ থাকলেও এবার তিন এমপির মধ্যে সম্পর্ক বেশ আন্তরিক বলেই জানা যায়। দীপেন দেওয়ান দায়িত্ব পাওয়ার পর জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পাহাড়ের পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ শুরু করেছিলেন। গত ১১ মে তিনি খাগড়াছড়ি সফরে গিয়ে একটি মতবিনিময় সভা করেন, যেখানে স্থানীয় এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন না। তবে ওয়াদুদ ভূঁইয়া সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিনি সেদিন সত্যিই অসুস্থ ছিলেন এবং দীপেনের সাথে তার চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। তিনি এই পদত্যাগের আসল কারণ জানেন না।
তাহলে আসল সমস্যা কোথায় লুকিয়ে আছে? স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রাঙামাটির রাজনীতিতে নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েই মূলত এই দ্বন্দ্বের শুরু। দীপেন দেওয়ানের অনুসারীদের সাথে জেলা বিএনপির সভাপতি দীপন তালুকদারের অনুসারীদের একটি নীরব স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল, যা এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। তবে দীপন তালুকদার দলীয় কোন্দলের এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, মন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছুই জানতেন না এবং এটি তার একান্তই ব্যক্তিগত একটি সিদ্ধান্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৮ সালের ১৫ জুলাই। ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে পাহাড়ি বা উপজাতীয় কোটা থেকে একজনকে নিয়োগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। পাহাড়ের ৩টি জেলার উন্নয়ন ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতি বছর সরকার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) অর্থায়ন করে থাকে। এই বিপুল বাজেটের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% সরাসরি খরচ করা হয় স্থানীয় অবকাঠামো, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে। তাই এই মন্ত্রণালয়ে একজন সৎ ও যোগ্য নেতার ধারাবাহিকতা খুব জরুরি। বর্তমানে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।
পাহাড়ের সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে ঢাকার দিকে তাকিয়ে আছেন। তারা অপেক্ষা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কী সিদ্ধান্ত নেন। দীপেন দেওয়ানের এই হঠাৎ বিদায় বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্রকাঠামো মেরামত কর্মসূচির বাস্তবায়নে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করবে বলে স্থানীয় নেতারা মনে করছেন। পাহাড়ি ও বাঙালিদের নিয়ে একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ার যে উদ্যোগ দীপেন শুরু করেছিলেন, তা মাঝপথে থেমে গেলে পাহাড়ের অর্থনীতি ও শান্তিশৃঙ্খলা আবারও হুমকির মুখে পড়বে। দ্রুত এই রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে রাঙামাটিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ও ক্ষোভ আরও অনেক বাড়বে।














