শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী: চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সেই ভয়াল রাত ও এক অবিসংবাদিত নেতার বিদায়

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

আজ ৩০ মে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত শোকাবহ, কালো ও রক্তস্নাত দিন। ১৯৮১ সালের ঠিক এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী ও বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার বুলেটের আঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান। তাঁর এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যু সেদিন পুরো জাতিকে গভীরভাবে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে এভাবে রাতের অন্ধকারে হত্যা করার ঘটনা দেশের মানুষকে চরম আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়। সাধারণ মানুষ সেদিন তাদের এক প্রিয় ও মাটির কাছের নেতাকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।

জিয়াউর রহমান শুধু একজন সেনাপ্রধান বা রাষ্ট্রপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর সেনানী। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে দিশেহারা মুক্তিকামী মানুষ সেদিন নতুন করে যুদ্ধ করার প্রবল সাহস পেয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তনের এক জটিল ও সংকটময় সময়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি সদ্য স্বাধীন দেশকে তিনি তিলে তিলে নতুন করে গড়ার কাজ শুরু করেন।

মৃত্যুর কয়েক দিন আগে থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত ছিল। দলের একটি অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো এবং নেতাদের সাথে সরাসরি কথা বলার জন্য তিনি ২৯ মে চট্টগ্রামে যান। সেদিন সারাদিন ব্যস্ত সময় পার করার পর তিনি রাতে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন। দেশের রাষ্ট্রপতি হলেও তাঁর নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব একটা কড়াকড়ি ছিল না। তিনি সব সময় সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসতেন এবং নিজের সেনাবাহিনীর সদস্যদের ওপর তাঁর অগাধ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ৩০ মে ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে সেই বিশ্বাস চরমভাবে ভেঙে যায়। একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সার্কিট হাউসে অতর্কিত হামলা চালায়। বৃষ্টির মতো বুলেটের ব্রাশফায়ারে তারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন ও আধুনিক যুগের সূচনা করেছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন, দেশকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হলে অর্থনীতির চাকা দ্রুত ঘোরাতে হবে। তাঁর আমলেই বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি উদ্যোগে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। আজ যে লাখ লাখ প্রবাসী দেশে প্রতি বছর প্রায় ২২ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার ($) রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি তিনিই তৈরি করে দিয়েছিলেন। এছাড়া তৈরি পোশাকশিল্পের বা গার্মেন্টসের যে বিশাল যাত্রা তাঁর সময়ে শুরু হয়েছিল, তা আজ আমাদের মোট জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪% থেকে ৮৫% দখল করে আছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন এবং কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে বের হয়ে এসে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু করেন। দেশের সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার সমান সুযোগ করে দেন তিনি। ১৯৭৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর যুগান্তকারী ১৯ দফা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের মনের মণিকোঠায় স্থায়ী জায়গা করে নেন। উৎপাদনমুখী রাজনীতি এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির যে ধারণা তিনি চালু করেছিলেন, তা দেশকে নতুন একটি দিশা দিয়েছিল।

৩০ মে সকালে রেডিওর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর খবর সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। খবর শোনার পর মানুষ শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। প্রথমে তাঁকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় গোপনে সমাহিত করা হলেও পরে মানুষের তীব্র দাবির মুখে তাঁর মরদেহ ঢাকায় আনা হয়। শেরেবাংলা নগরে যখন তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, তখন লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে। ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট মানুষে মানুষে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ইতিহাসে এত বড় ও আবেগঘন জানাজা খুব কমই দেখা গেছে। গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে শহরের রিকশাচালক ও খেটে খাওয়া মানুষ—সবাই সেদিন তাদের প্রিয় নেতার জন্য অঝোরে চোখের জল ফেলেছিলেন।

৪ দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু দেশের মানুষ এখনো জিয়াউর রহমানকে ভোলেনি। আজ যখন ৩০ মে ফিরে আসে, দেশের মানুষ গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও বেদনার সাথে এই মহান নেতাকে স্মরণ করে। বিএনপি ও এর সব অঙ্গসংগঠন দিনটিকে ‘শাহাদাতবার্ষিকী’ হিসেবে অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালন করে। দেশের প্রতিটি প্রান্তে কোরআন খতম, দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা ও অসহায়দের মাঝে খাবার বিতরণের মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করা হয়। জিয়াউর রহমান আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর দেখানো স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন আজও এদেশের কোটি কোটি মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়।

সম্পর্কিত নিবন্ধ