ঝিনাইদহ জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনবহুল উপজেলা হলো শৈলকুপা। এখানকার মাটি উর্বর এবং মানুষের জীবনযাত্রা কৃষিনির্ভর ও সহজ-সরল। কিন্তু এই ঐতিহ্যের পাশাপাশি শৈলকুপার নামের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে ছিল একটি কালো দাগ দলাদলি, গ্রাম্য রাজনীতি আর রক্তক্ষয়ী সংঘাত। বিশেষ করে ঈদের মতো বড় সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসবগুলোতে যখন মানুষের মুখে হাসি থাকার কথা, তখন শৈলকুপার মানুষের মনে কাজ করত এক অজানা আতঙ্ক। কিন্তু এবারের ঈদের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। চারদিকে কোনো সংঘাত নেই, রক্তপাত নেই, লাঠিয়াল বাহিনীর মহড়া নেই। দীর্ঘ ৫৪ বছরের রেকর্ড ভেঙে এবার শৈলকুপায় উদযাপিত হয়েছে এক অভূতপূর্ব শান্তির ঈদ। এই অবিশ্বাস্য পরিবর্তন কোনো জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় হয়নি। সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল একবাক্যে স্বীকার করছেন, এই অসাধ্য সাধন হয়েছে বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানের পক্ষপাতদৃষ্টি না থাকার কারণে। তাঁর কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থানের ফলেই আজ শৈলকুপার মানুষ শান্তির সুবাতাস উপভোগ করছেন।
শৈলকুপার অতীত: উৎসব মানেই যেখানে ছিল অজানা আতঙ্ক
শৈলকুপার অতীত ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এখানকার গ্রামগুলোতে সামাজিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সবসময় দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে দলাদলি লেগেই থাকত। তুচ্ছ কোনো ঘটনা, যেমন ক্ষেতে ছাগল যাওয়া, চায়ের দোকানে কথা কাটাকাটি বা রাস্তায় হাঁটাকে কেন্দ্র করে শুরু হতো ভয়াবহ সংঘর্ষ। আর ঈদের সময় এই সংঘাত রূপ নিত চরম আকার। ঈদের ছুটিতে ঢাকা বা অন্যান্য শহর থেকে গ্রামের মানুষ বাড়িতে ফিরতেন। জনবল বেড়ে যাওয়ায় গ্রাম্য মাতব্বররা এই সময়টাকে তাদের শক্তি প্রদর্শনের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে বেছে নিতেন। ঈদের নামাজের মাঠে বা ঈদের পরের দিনগুলোতে ঢাল, সড়কি, রামদা নিয়ে এক গ্রাম আরেক গ্রামের ওপর বা এক গোষ্ঠী আরেক গোষ্ঠীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। উৎসবের দিনগুলোতে হাসপাতালগুলো আহত রোগীতে ভরে যেত, বাতাসে ভাসত স্বজন হারানো মানুষের কান্না।
দীর্ঘ ৫৪ বছরের সংঘাতময় কলঙ্কিত অধ্যায়ের অবসান
স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৪ বছরে শৈলকুপার মানুষ এমন কোনো ঈদ দেখেনি, যেখানে কোনো না কোনো গ্রামে মারামারি বা খুনের ঘটনা ঘটেনি। এই দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সংঘাত যেন শৈলকুপার একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। যুগের পর যুগ ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, অনেক জনপ্রতিনিধি এসেছেন, গেছেন, কিন্তু শৈলকুপার এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এই সংঘাত আরও তীব্রতর হয়েছিল। কিন্তু এবারের ঈদ সেই ৫৪ বছরের পুরোনো অন্ধকার ইতিহাসকে চিরতরে মুছে দিয়েছে। এবার গ্রামের মেঠো পথে লাঠিয়ালদের দৌরাত্ম্য ছিল না, ছিল না কোনো বাড়িঘরে হামলা বা লুটপাটের ঘটনা। একটি রক্তপাতহীন ও শান্তিময় ঈদ উদযাপন করে শৈলকুপার মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানের জিরো টলারেন্স ও নিরপেক্ষ অবস্থান
এই ৫৪ বছরের রেকর্ড ভাঙার পেছনের মূল কারিগর হিসেবে সবাই আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন। কারণ, অতীতে যারা ক্ষমতায় থাকতেন, তারা নিজেদের ভোট ব্যাংক ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য কোনো না কোনো পক্ষকে ইন্ধন জোগাতেন। প্রভাবশালীদের এই পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণেই অপরাধীরা পার পেয়ে যেত। কিন্তু মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে শৈলকুপার ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছেন যে, অপরাধী যে দলের বা যে গোষ্ঠীরই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তাঁর এই পক্ষপাতহীন দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই গ্রাম্য মাতব্বররা বুঝতে পেরেছেন যে, এবার আর ওপর তলার কোনো নেতার আশীর্বাদ বা রাজনৈতিক ছাতা তাদের মাথার ওপর নেই।
স্বাধীন ও প্রভাবমুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী
যখন ওপর থেকে কোনো অবৈধ রাজনৈতিক চাপ থাকে না, তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা স্বাধীন ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, এবারের ঈদে শৈলকুপা তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অতীতে পুলিশ কোনো অপরাধীকে ধরতে গেলে রাজনৈতিক নেতাদের ফোন আসত তাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। ফলে প্রশাসন চাইলেও অনেক সময় নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারত না। কিন্তু আইনমন্ত্রীর স্পষ্ট ও নিরপেক্ষ নির্দেশনার কারণে এবার পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। ঈদের আগে থেকেই সম্ভাব্য দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কেউ দলাদলির চেষ্টা করলেই তাকে তাৎক্ষণিক আইনের আওতায় আনা হয়েছে। প্রশাসনের এই নিরপেক্ষ ও কঠোর ভূমিকার কারণেই সংঘাত অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
দলাদলি ও গ্রাম্য মাতব্বরদের আধিপত্যের পতন
শৈলকুপায় দলাদলি টিকিয়ে রাখার মূল কারিগর ছিল কিছু গ্রাম্য মাতব্বর বা মোড়ল, যারা সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করত। এরা নিজেদের স্বার্থে গ্রামের মানুষকে বিভক্ত করে রাখত এবং সংঘাত বাধিয়ে ফায়দা লুটত। কিন্তু আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামানের পক্ষপাতহীন নীতির কারণে এই মাতব্বরদের আধিপত্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, সংঘাত বাধিয়ে এবার আর পার পাওয়া যাবে না এবং কোনো নেতাই তাদের পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে আসবে না। আইনি শাস্তির ভয়ে এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয় না পেয়ে এই সুযোগসন্ধানী মাতব্বররা এবার একেবারে চুপসে গিয়েছিল, যার সরাসরি সুফল পেয়েছে সাধারণ মানুষ।
সাধারণ মানুষের মনে ফিরে আসা পরম স্বস্তি
এবারের ঈদে শৈলকুপার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে যে পরম শান্তি ও স্বস্তি বিরাজ করেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মায়েরা এবার নিশ্চিন্তে তাদের সন্তানদের ঈদের মাঠে পাঠিয়েছেন। কোনো অঘটনের ভয়ে যুবকদের আর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকতে হয়নি। ঈদের দিন ও এর পরের দিনগুলোতে মানুষ মনের আনন্দে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ঘুরে বেরিয়েছেন। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। একসময় যে মানুষেরা আতঙ্কে ঈদের রাত পার করতেন, তারা এবার শান্তির ঘুমে রাত কাটিয়েছেন। সাধারণ মানুষের এই হাসিমুখ এবং স্বস্তি প্রমাণ করে যে, সঠিক ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব পেলে সমাজ থেকে কত দ্রুতই না অশান্তি দূর করা সম্ভব।
আগামীর জন্য এক নতুন শৈলকুপার স্বপ্ন
৫৪ বছরের রেকর্ড ভেঙে এবারের শান্তির ঈদ শৈলকুপাবাসীর মনে এক নতুন স্বপ্নের বীজ বপন করেছে। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, শৈলকুপা মানেই শুধু সংঘাত আর দলাদলি নয়; এখানকার মানুষও শান্তিতে বাঁচতে জানে। এই ঈদ প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ে যদি সৎ, যোগ্য এবং পক্ষপাতহীন নেতৃত্ব থাকে, তবে তৃণমূল পর্যায়ের চিত্র বদলাতে খুব বেশি সময় লাগে না। মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান শৈলকুপার মানুষের জন্য যে শান্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে দিয়েছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য এক নতুন শৈলকুপার দরজা খুলে দিয়েছে। মানুষ এখন স্বপ্ন দেখছে একটি সংঘাতমুক্ত, আধুনিক ও উন্নত শৈলকুপার, যেখানে মেধা ও শ্রমের মূল্যায়ন হবে, লাঠির জোরের নয়।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, শৈলকুপায় ৫৪ বছরের রেকর্ড ভেঙে এবারের যে শান্তির ঈদ উদযাপিত হলো, তা শুধু একটি সাময়িক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বিশাল সামাজিক পরিবর্তনের মাইলফলক। একটি এলাকার মানুষের ভাগ্য বদলাতে যে সদিচ্ছা আর নিরপেক্ষতার প্রয়োজন, বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করেছেন। তাঁর পক্ষপাতদৃষ্টি না থাকার কারণেই আজ শৈলকুপার আকাশে এত শান্তির সুবাতাস। আমরা আশা করি, শান্তির এই ধারা শুধু এই ঈদেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আগামী দিনগুলোতেও তা অব্যাহত থাকবে। দলাদলি ও সংঘাতের অন্ধকার অতীত পেছনে ফেলে শৈলকুপা এভাবেই সামনের দিকে এগিয়ে যাবে, এক সুন্দর ও আলোকিত ভবিষ্যতের দিকে।














