চুলের ছোট্ট একটি গুটি যেভাবে উদ্‌ঘাটন করল আজমিরা হত্যার রহস্য

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

সবাই ধরে নিয়েছিল এটি একটি সাধারণ আত্মহত্যার ঘটনা। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দাবি ছিল, গভীর রাতে নিজেদের ঘরের আড়ার সাথে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন আজমিরা খাতুন। পুলিশ যখন লাশ উদ্ধার করে, তখন তার শরীরে বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। এমনকি ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকও সুরতহাল দেখে আত্মহত্যার পক্ষেই মত দিয়েছিলেন। থানা-পুলিশও খুব দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দিয়ে বলে, আজমিরা আসলেই আত্মহত্যা করেছেন[1]। কিন্তু একটি মৃত্যু, যার পেছনের গল্প এত সহজ মনে হচ্ছিল, তা আসলে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তার প্রমাণ মিলেছে ছোট্ট একটি বুনো গুটির সূত্র ধরে।

ঘটনার শুরু ২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল, টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার পুংলীপাড়া গ্রামে। সেদিন সকালে স্বামী আবদুর রহমান ভোলার বাড়ি থেকে আজমিরা খাতুনের নিথর দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এক মাসের মধ্যেই থানা-পুলিশ এটিকে অপমৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু আজমিরার বাবা জুরান আলী শেখ কোনোভাবেই এই প্রতিবেদন মানতে রাজি ছিলেন না। মেয়ের মৃত্যু নিয়ে তার মনে গভীর সন্দেহ ছিল। তিনি সোজা আদালতে গিয়ে মামলা করেন। এরপর আদালতের নির্দেশে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব যায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের হাতে। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে এক লোমহর্ষক হত্যার গল্প।

পিবিআই কর্মকর্তারা যখন তদন্ত শুরু করেন, প্রথমেই তারা আজমিরার লাশের ছবিগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করেন। ছবিতে দেখা যায়, মৃতদেহের চুলে কয়েকটি ছোট্ট আঁকড়ার গুটি আটকে আছে। এই দৃশ্য দেখে পিবিআই কর্মকর্তাদের মনে খটকা লাগে। প্রশ্ন জাগে, ঘরের ভেতর গলায় ফাঁস দিয়ে মারা যাওয়া এক নারীর চুলে ডোবার পাশের জঙ্গলে জন্মানো বুনো আঁকড়াগাছের গুটি এল কোথা থেকে? এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পুরো তদন্তের মোড় ঘুরে যায়।

তদন্তে জানা যায়, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে গ্রাম্য সালিসের চাপে আজমিরা ও আবদুর রহমানের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু আবদুর রহমানের পরিবার এই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হওয়ায় আজমিরাকে তার বাবার বাড়িতেও যেতে দেওয়া হতো না। তার ওপর চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ঘটনার দিন, অর্থাৎ ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল রাত ১১টার পর আজমিরার স্বামী আবদুর রহমান, শ্বশুর সাঈদ আকন্দ, শাশুড়ি বুলবুলি বেগম এবং দুই ননদ আকলিমা ও আমেনা বেগম মিলে তাকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

হত্যার পর এই পরিবারটি লাশ গুম করার এক ভয়ংকর ছক কষে। তারা আজমিরার লাশ ধরাধরি করে বাড়ির পশ্চিম পাশে ডোবার কাছের একটি আঁকড়াগাছের জঙ্গলে নিয়ে যায়। সেখানে একটি গর্ত খুঁড়ে লাশ মাটিচাপা দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। কিন্তু গভীর রাতে এমন কাজ করতে গিয়ে তারা ভয় পেয়ে যায় যে কেউ হয়তো দেখে ফেলতে পারে। ধরা পড়ার আশঙ্কায় তারা মাটি থেকে লাশ তুলে আবার ঘরে নিয়ে আসে। এরপর লাশটি ধুয়ে খাটের ওপর শুইয়ে রাখা হয় এবং পরদিন সকালে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার গল্প সাজিয়ে গ্রামবাসীকে জানানো হয়। কিন্তু জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার সময় আজমিরার চুলে যে আঁকড়াগাছের গুটি আটকে গিয়েছিল, তা তারা খেয়াল করেনি। আর এই ছোট্ট গুটিটিই শেষ পর্যন্ত খুনিদের ধরিয়ে দেয়।

পিবিআইয়ের তদন্তে থানা-পুলিশের বেশ কিছু গাফিলতিও ধরা পড়ে। প্রথমত, ছবির একটিতে দেখা যায়, আজমিরার গলার নিচের দিকে অর্ধচন্দ্রাকৃতির কালচে দাগ রয়েছে, যা সাধারণত ফাঁস দেওয়ার ঘটনায় ওপরের দিকে থাকার কথা। দ্বিতীয়ত, লাশের চুলে আঁকড়ার গুটি এবং মুখে মাটি লেগে থাকা সত্ত্বেও পুলিশ সেদিকে নজর দেয়নি। দাফনের আগে লাশ ধোয়ার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও জানান, তারা লাশের মাথা থেকে ১৫-২০টি গুটি ফেলেছিলেন। এ ছাড়া ডোবার পাশে একটি সদ্য খোঁড়া গর্তেরও সন্ধান পাওয়া যায়। পিবিআই বলছে, থানা-পুলিশ এই মামলার ক্ষেত্রে চরম দায়সারা তদন্ত করেছিল।

পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, “মাঝে মাঝে একটি ছোট্ট আলামতই পুরো তদন্তের গতিপথ বদলে দিতে পারে। আজমিরার চুলে আটকে থাকা আঁকড়ার গুটিই প্রমাণ করেছে যে তিনি আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে”। চলতি বছরের জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি বইয়ে এই চাঞ্চল্যকর হত্যা রহস্য উদ্‌ঘাটনের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

সম্পর্কিত নিবন্ধ