ঝিনাইদহের আকাশে বাতাসে এখন উৎসবের দারুণ আমেজ। শিক্ষার্থীদের সুপ্ত মেধা ও মননের বিকাশের লক্ষ্যে আয়োজিত ‘মেধা মনন উৎসব ২০২৫’-এর বর্ণাঢ্য সমাপনী ও কৃতী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান আজ অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৫০টির বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক এবং শিক্ষকেরা প্রবল উৎসাহ নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হতে থাকেন। বিশাল প্যান্ডেলের প্রায় ১০০% আসন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চোখেমুখে ছিল দারুণ এক আনন্দ আর নতুন কিছু জেতার উত্তেজনা। এই চমৎকার আয়োজনের মাধ্যমে স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
এই আনন্দঘন আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সরকারের মাননীয় আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি হাসিমুখে মঞ্চে উঠলে উপস্থিত হাজারো শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা তাকে বিপুল করতালি দিয়ে উষ্ণ স্বাগত জানান। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত সহজ ও সুন্দর ভাষায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দারুণ সব দিকনির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, শুধু বইয়ের পাতায় মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে আজকের এই আধুনিক যুগে টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে অবশ্যই মেধা ও মননের সঠিক বিকাশ ঘটাতে হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় পুরোপুরি জোর দেওয়ার আহ্বান জানান। কারণ, নৈতিকতা ছাড়া শুধু প্রযুক্তি মানুষের বড় ধরনের ধ্বংসই ডেকে আনে।
বিশ্বায়নের এই যুগে উন্নত দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে চলতে হলে আমাদের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কীভাবে প্রস্তুত হতে হবে, সে বিষয়েও খোলামেলা কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দেন, আজকের এই তরুণরাই আগামী দিনে দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবে। তারা যদি এখন থেকেই বিশ্বমানের জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তবে ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের ঘরে বসেই হাজার হাজার ডলার ($) আয় করে দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে পারবে। তাই তিনি শিক্ষার্থীদের অযথাই সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় নষ্ট না করে নিজেদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য রাখেন সাবেক সচিব মীর সাহাবুদ্দীন, বিশিষ্ট সমাজসেবক প্রবীর সাহা বিদ্যুৎ এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান। তারা সবাই একমত হয়ে বলেন যে, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও নিয়মিত জ্ঞানচর্চার কোনো বিকল্প নেই। একজন বক্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান টেনে বলেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রযুক্তির কারণে প্রায় ৪০% পুরোনো পেশা বাজার থেকে হারিয়ে যাবে। তাই এখন থেকেই সৃজনশীল চিন্তাভাবনা না বাড়ালে আমাদের তরুণরা অনেক পিছিয়ে পড়বে। এই ধরনের মেধাভিত্তিক আয়োজন শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস অন্তত কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় এবং তাদের ভেতরের লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে।
উৎসবের একপর্যায়ে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মাহেন্দ্রক্ষণ। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় যেমন- কুইজ, বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতায় বিজয়ী এবং কৃতী শিক্ষার্থীদের মঞ্চে ডেকে নেন আয়োজকরা। এরপর অতিথিরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাদের হাতে সম্মাননা স্মারক, আকর্ষণীয় সনদ ও পুরস্কার তুলে দেন। মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও উৎসাহ দিতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে বই ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ করা হয়। নিজেদের হাতে এমন সুন্দর পুরস্কার পেয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস লক্ষ করা যায়। পুরস্কার বিতরণের পাশাপাশি পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল চমৎকার সব দেশাত্মবোধক গান, নাচ ও আবৃত্তিসহ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। শিক্ষার্থীদের নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই সাংস্কৃতিক আয়োজন উপস্থিত হাজারো দর্শককে মুগ্ধ করে রাখে।
এই বিশাল ও সফল আয়োজনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই সার্বিক সহযোগিতা করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষ উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও জনপ্রতিনিধিরা। পুরো অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট সংগঠক মাসুম বিল্লাহ তুষার। তিনি তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, এলাকার সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সবার সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সবাই এক হয়ে ভালো কাজে পাশে থাকলে এমন বড় আয়োজন করা মোটেও কোনো কঠিন কাজ নয়। তিনি এমন একটি সফল ও সুন্দর অনুষ্ঠান উপহার দেওয়ার জন্য উপস্থিত সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
মেধা মনন উৎসবের আয়োজকরা দৃঢ়কণ্ঠে জানান, গ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে তাদের এই মহতী উদ্যোগ এখানেই থেমে থাকবে না। ভবিষ্যতেও প্রতি বছর তারা এ ধরনের গঠনমূলক আয়োজন নিয়মিত চালিয়ে যাবেন। অভিভাবকরাও এমন চমৎকার আয়োজনে দারুণ খুশি। তারা জানান, শুধু শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার পাশাপাশি এমন সুস্থ প্রতিযোগিতা বাচ্চাদের মানসিক বিকাশে দারুণ সাহায্য করে। পুরো অনুষ্ঠানটি ঝিনাইদহের স্থানীয় শিক্ষাঙ্গনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। উপস্থিত অতিথিরা আয়োজকদের এই চমৎকার উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আগামী দিনেও এমন আয়োজনে সব ধরনের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন।














