এস আলমের ইসলামী ব্যাংকসহ একে একে ছয়টি ব্যাংক দখলের কাহিনি এখন আর কারও অজানা নেই। ব্যাংক ডাকাতির ইতিহাস পুরোনো হলেও ব্যাংকের মালিকানা দখলের ঘটনা পৃথিবীতে খুব একটা দেখা যায় না। এর আগে ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু অস্ত্র হাতে ইউসিবিএল দখল করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হলেও তাঁর ভাগনে এস আলম রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনীকে ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে এই ব্যাংকগুলো দখল করে নেন। অন্যান্য দেশেও এমন ঘটনা ঘটেছে। তবে সেসব দেশ অপরাধীদের সাথে কী আচরণ করেছে, আর আমাদের দেশে নতুন আইনে কী সুযোগ রাখা হয়েছে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
এ ধরনের ব্যাংক চুরির একটি বড় উদাহরণ হলো মলদোভা। ইউরোপের অন্যতম দরিদ্র দেশ মলদোভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ছিল ‘বানকা দে একোনোমিই’। ২০১২ সাল পর্যন্ত এই ব্যাংকের ৫৬.১৩% শেয়ার সরকারের হাতে থাকলেও, পরে এর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইলান শোর নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতে। ২০১৪ সালের ২৪ থেকে ২৬ নভেম্বর মাত্র এই তিন দিনে ইলান শোর মলদোভার তিনটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার বা ১ বিলিয়ন $ ঋণের নামে তুলে পাচার করেন। এই বিপুল অর্থ ছিল দেশটির মোট জিডিপির প্রায় ৮%। এই ঘটনাকে মলদোভায় আজও ‘শতাব্দীর সেরা চুরি’ বলা হয়।
বাংলাদেশেও এমন একটি ‘ভয়ংকর নভেম্বর’ ঘটেছিল। ২০২২ সালের ১ থেকে ১৭ নভেম্বরের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকসহ তিনটি ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল। মলদোভায় চুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সরকার ব্যাংকগুলোকে বাঁচাতে ৮৭ কোটি ডলার সহায়তা দেয়। কিন্তু এর ফলে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় এবং মুদ্রার মান পড়ে যায়। পরবর্তীতে এই চুরির মূল হোতা ইলান শোরকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যদিও তিনি পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নেন, তবে মলদোভার সরকার তাকে আর কখনোই ব্যাংকের মালিকানা ফেরত দেয়নি।
কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়লে তাকে বিশেষ আইনি ব্যবস্থায় বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়, যাকে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন’ বলে। এর মূল লক্ষ্য হলো আমানতকারীদের টাকা সুরক্ষিত রাখা। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর এই বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে জোরদার হয়। বাংলাদেশে ২০২৫ সালের ৯ মে প্রথম ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। তখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় ছিল। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেউলিয়া হওয়ার পথে থাকা ইসলামি ধারার পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে বিতর্ক শুরু হয় বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, যখন এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়া হয়। নতুন পাস হওয়া আইনের ১৮ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যাঁরা এর মালিক বা শেয়ারহোল্ডার ছিলেন, তাঁরা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। যদিও এর জন্য তাদের আগের ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও পাওনাদারের টাকা শোধ করতে হবে, তবে পুরোনো মালিকদের আবার ফিরে আসার সুযোগ রাখা নিয়েই প্রবল সমালোচনা শুরু হয়েছে। ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি নেতারাও এই ধারা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন।
এক্ষেত্রে ইউক্রেন বিশ্বের জন্য একটি অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করেছে। ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ‘প্রিভাতব্যাংক’ থেকে প্রায় ২০০ কোটি ডলার বা ২ বিলিয়ন $ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ধরা পড়লে ২০১৬ সালে সরকার সেটি জাতীয়করণ করে। ব্যাংকের সাবেক মালিক ইহর কলোমোইস্কি ব্যাংকটি ফিরে পেতে আদালতে গেলে ইউক্রেন সরকার ২০২০ সালে নতুন একটি আইন পাস করে। এই আইনে বলা হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্ধার হওয়া কোনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ আর কখনোই পুরোনো মালিককে ফেরত দেওয়া যাবে না। পরে ইউক্রেনের সুপ্রিম কোর্টও কলোমোইস্কির আপিল খারিজ করে দেয়। এই আইনটি ইউক্রেনে ‘অ্যান্টিকলোমোইস্কি ল’ নামে পরিচিতি পায়।
মলদোভা এবং ইউক্রেন তাদের দেউলিয়া ব্যাংকগুলোর আগের মালিকদের আর কখনোই ফিরে আসার সুযোগ দেয়নি। ইউক্রেন তো নতুন আইন করে পুরোনো দুর্নীতিবাজ মালিকদের ফেরার সব পথ চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউক্রেনের এই উদাহরণ মাথায় রেখে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের উচিত সদ্য পাস হওয়া ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনটি পুনরায় সংশোধন করা। পুরোনো মালিকেরা যাতে কোনোভাবেই আর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পান, তা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল আমরা এই আইনকে ‘অ্যান্টি এস আলম ল’ হিসেবে গর্বের সাথে ডাকতে পারব।
















