আমাদের সমাজের অন্যতম বড় একটি ব্যাধি হলো মাদক। গ্রাম থেকে শহর সব জায়গাতেই এই বিষাক্ত ছোবল তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য পরিবার তাদের শান্তি হারাচ্ছে। তবে প্রশাসনও হাত গুটিয়ে বসে নেই। মাদকের বিস্তার ঠেকাতে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। শুক্রবার রাত ঠিক ১০টার দিকে উপজেলা প্রশাসনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি ঝটিকা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এই চমৎকার অভিযানে মাদকদ্রব্য নিজ হেফাজতে রাখার অপরাধে এক যুবককে হাতেনাতে ধরে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক বিচার স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
ঘটনার শুরু হয় এলাকার সচেতন মানুষের দেওয়া একটি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে। উপজেলা প্রশাসন নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পায় যে, শৈলকুপা উপজেলার ৯ নম্বর মনোহরপুর ইউনিয়নের দামুদিয়া গ্রামে রাতের অন্ধকারে মাদকের বেচাকেনা ও সেবন চলছে। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই কালক্ষেপণ না করে পুলিশ সদস্যদের সাথে নিয়ে ওই নির্দিষ্ট এলাকায় জোরালো অভিযান চালান শৈলকুপার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহফুজুর রহমান। গ্রামের একটি নির্জন জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে তারা মো. সোহেল জোয়ার্দার নামের ৩৫ বছর বয়সী এক যুবককে আটক করেন। সোহেলের বাবার নাম মৃত ছমীর জোয়ার্দার। আটকের পর তার শরীর ও আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
মাদকসহ হাতেনাতে ধরা পড়ার পর সোহেল জোয়ার্দারকে তাৎক্ষণিকভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে হাজির করা হয়। ইউএনও মো. মাহফুজুর রহমান নিজেই স্পটে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে এই আদালত পরিচালনা করেন। উপস্থিত সবার সামনে সোহেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এরপর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় অপরাধী সোহেলকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন ম্যাজিস্ট্রেট। রায়ের পরপরই পুলিশ সদস্যরা তাকে কড়া পাহারায় কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। দীর্ঘ মেয়াদি মামলার আইনি জটিলতায় না গিয়ে সরাসরি স্পটে এমন দ্রুত বিচার দেখে উপস্থিত গ্রামবাসী বেশ অবাক ও খুশি হন।
মাদকের কারণে আমাদের দেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় যে কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তা কল্পনা করাও কঠিন। বিশ্বজুড়ে মাদকের অবৈধ বাজার এখন কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।আমাদেরদেশের প্রত্যন্ত গ্রামেও এই বিশাল কালো বাজারের প্রভাব পড়ছে।গ্রামের একজন সাধারণ মাদ কাসক্ত ব্যক্তি প্রতিদিন গড়ে ৩০০থেকে ৫০০টাকা, অর্থাৎ প্রায়)ছাড়িয়েগেছে। নিজের পকেটে টাকা না থাকলে তারা চুরি, ছিনতাইয়ের মতো জঘন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। পুলিশের বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, গ্রামগঞ্জে ঘটা ছোটখাটো অপরাধের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% সরাসরি এই মাদকের সাথে জড়িত। তাই সোহেলের মতো অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি দিলে সমাজে চুরি ও ছিনতাইয়ের হার অনেকটাই কমে আসবে।
অভিযান শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহফুজুর রহমান উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, মাদক আমাদের যুবসমাজ ও সমাজকাঠামোকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। কোনোভাবেই এই বিষাক্ত জিনিস সমাজে আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি ঘোষণা করেছে। সেই নীতির আলোকেই শৈলকুপায় তারা নিয়মিত এই ধরনের কঠোর অভিযান চালাচ্ছেন। তিনি পরিষ্কার করে জানিয়ে দেন, ভবিষ্যতেও কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকসেবী প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে পারবে না। তাদের এই সাঁড়াশি অভিযান আগামী দিনগুলোতে আরও ১০০% গতিশীল হবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা উপজেলা প্রশাসনের এই সাহসী উদ্যোগকে প্রাণঢালা সাধুবাদ জানিয়েছেন। মনোহরপুর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ জানান, এলাকায় কিছু বখাটে যুবক অনেক দিন ধরেই মাদকের আখড়া গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। তাদের অত্যাচারে এলাকার বয়স্ক মানুষ ও স্কুল-কলেজগামী ছেলেমেয়েরা শান্তিতে রাস্তায় হাঁটতে পারত না। এখন প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপের কারণে অপরাধীরা ভয়ে এলাকা ছাড়বে বলে তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। তারা ইউএনও মহোদয়ের কাছে বিনীত দাবি জানান, যেন প্রতি সপ্তাহে অন্তত ২ থেকে ৩ দিন এ রকম ঝটিকা অভিযান চালানো হয়। এতে করে এলাকাটি খুব দ্রুত পুরোপুরি মাদকমুক্ত হবে।
মাদক নির্মূল করতে শুধু পুলিশের অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালতই কিন্তু যথেষ্ট নয়। প্রশাসন তাদের দায়িত্ব পালন করছে, কিন্তু আমাদের সমাজের প্রতিটি পরিবারকেও সচেতন হতে হবে। বাবা-মাকে খেয়াল রাখতে হবে তাদের সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে এবং অতিরিক্ত টাকা খরচ করছে কি না। এলাকার প্রতিটি মানুষ যদি প্রশাসনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে, তবে খুব দ্রুতই শৈলকুপা একটি আদর্শ ও মাদকমুক্ত উপজেলা হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
















