বর্তমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এরপর প্রায় ১০০ দিন পার হওয়ার পর তাদের কাজের মূল্যায়ন করতে একটি বিশেষ অনলাইন আলোচনার আয়োজন করা হয়। ‘বিএনপি সরকারের ১০০ দিন একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক এই আলোচনাটি গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় আয়োজন করে সমাজ গবেষণাকেন্দ্র। আলোচনায় দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক এবং সরকারের উপদেষ্টারা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রমে বেশ কিছু জনবান্ধব উদ্যোগের আভাস পাওয়া গেছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব উদ্যোগের মধ্যে নীতিগত গভীরতা, স্বচ্ছতা এবং সমন্বিত চিন্তার অনেক ঘাটতি রয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এ প্রায় ৪১৫টি কর্মসূচির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক কর্মসূচির মধ্যে কোনগুলো আগে করা উচিত, সেই অগ্রাধিকার নির্ধারণে ঘাটতি দেখছেন তিনি।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশে আয়বৈষম্য খুব দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু বিএনপির ইশতেহারে এই বৈষম্য কমানোর কোনো নির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। তবে তিনি মূল্যস্ফীতির সাথে মজুরি সমন্বয়, কৃষক কার্ড এবং ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। সুশাসনের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সংস্কার ও জবাবদিহির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়া পরিবেশ ও নদীনীতির ক্ষেত্রেও বড় প্রকল্পগুলোয় স্বচ্ছতা ও জন-আলোচনার ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে অনলাইনে আলোচনায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি সরকারের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে বলেন, সমালোচকরা যখন বিএনপির ১০০ দিনের মূল্যায়ন করছেন, তখন তারা একটি বড় বিষয় ভুলে যাচ্ছেন। সরকার এমন একটি অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করেছে, যেখানে ঋণের পাহাড়, ভঙ্গুর জ্বালানি ব্যবস্থা, শূন্য রিজার্ভ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ছিল। গত দেড় দশকের লুটপাট ও ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার সৃজনশীল পদ্ধতিতে এগোচ্ছে। তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ডে দারিদ্র্য স্কোরিং, কৃষকের ঋণ মওকুফ এবং কর ফাঁকি রোধে তিনটি টাস্কফোর্স গঠনের মতো কাজগুলো শুরু হয়েছে। বিভাজন নয়, সংহতিই হবে এই সরকারের মূল দর্শন।
দেশের অন্যতম বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান তার বক্তব্যে বলেন, বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক কর্মসূচি এখনো শুধু ঘোষণাপত্রেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তব নীতিনির্ধারণ ছাড়া সরকারের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝা সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের প্রধান সংকট শুধু প্রবৃদ্ধির নয়, বরং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের। দীর্ঘদিন ধরে উদারনৈতিক অর্থনীতির কারণে প্রবৃদ্ধি আসলেও দেশে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি আগের মতো দলীয়করণ চলতে থাকে, তবে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ মনে করেন, সরকার পরিবর্তনের পর মানুষের মধ্যে যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। উন্নয়ন দর্শন, মেগা প্রকল্প নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীলতার মতো পুরোনো বিষয়গুলো এখনো রয়ে গেছে। জনগণের মতামত ও স্বচ্ছতা ছাড়া বড় বড় সিদ্ধান্ত নিলে তা গণতান্ত্রিক প্রত্যাশাকে দুর্বল করে। অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল্লাহ বলেন, মাত্র তিন মাসের কার্যক্রম দেখে একটি সরকারের সামগ্রিক লক্ষ্য চূড়ান্তভাবে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। তবে তিনি সরকারের ঘোষিত সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে আন্তরিকতার ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছেন।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ ও লুটপাটের চক্র ভাঙতে হলে ব্যাংকিং ও কর খাতে বড় ধরনের সংস্কার এখনই জরুরি। কিন্তু প্রথম ১০০ দিনে সেই উদ্যোগ যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। তিনি ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষার কর্মসূচির সাফল্য চান, তবে এগুলো টেকসই অর্থায়নের অভাব ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সমাজ গবেষণাকেন্দ্রের সভাপতি তাজুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পালাক্রমে প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য যে ‘অস্ত্র’ তৈরি করেছে, তা বারবার নিজেদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়েছে। এই দুষ্টচক্র থেকে বের হতে হলে বিএনপিকে সত্যিকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নইলে জনগণের বিশ্বাস ধরে রাখা তাদের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ এবং সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
















