তীব্র গরম আর প্রতিদিনের ক্লাসের একঘেয়েমি থেকে অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে যাচ্ছে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী। পবিত্র ঈদুল আজহা এবং গ্রীষ্মকালীন অবকাশ উপলক্ষে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টানা লম্বা ছুটিতে যাচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার, ২১ মে ক্লাস শেষ হওয়ার পরপরই শিক্ষার্থীদের এই আনন্দময় ছুটি শুরু হয়ে যাবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন ছুটির তালিকা অনুযায়ী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে শিক্ষার্থীরা পাবে টানা ১৬ দিনের ছুটি। অন্যদিকে মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পাবে আরও বেশি, তাদের ছুটি চলবে টানা ২৩ দিন। সাধারণ হিসাবে প্রায় ১০০% শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রতি বছর এই লম্বা ছুটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। গরমে হাঁসফাঁস করা জনজীবনে এই ছুটি যেন এক পশলা বৃষ্টির মতো শান্তি নিয়ে এসেছে।
সরকারি শিক্ষাপঞ্জি বা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ছুটির আনুষ্ঠানিক শুরু হওয়ার কথা আগামী ২৪ মে থেকে। কিন্তু এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি দারুণ সুখবর যোগ হয়েছে। ২৪ মে মূল ছুটি শুরুর আগে ২২ ও ২৩ মে যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি পড়েছে। ফলে আজ বৃহস্পতিবারই হচ্ছে অধিকাংশ স্কুল-কলেজের শেষ কর্মদিবস। আগামী দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ঈদের ছুটিতে ঢুকে যাবে। অনেকেই এই লম্বা ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ঈদ উদ্যাপন করতে যাবেন। আবার সামর্থ্যবান অনেক পরিবার দেশের দর্শনীয় স্থান বা দেশের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
। তবে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছে শেকড়ের টানে গ্রামে ফেরাই এই ছুটির সবচেয়ে বড় ও আসল আনন্দ।
প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটির হিসাবটা একটু বিস্তারিত মিলিয়ে নেওয়া যাক। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ছুটি চলবে আগামী ৪ জুন পর্যন্ত। এরপর ৫ ও ৬ জুন আবার শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি রয়েছে। ফলে সব ছুটি শেষে আগামী ৭ জুন রোববার থেকে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান ও ক্লাস শুরু হবে। সাপ্তাহিক ছুটিগুলো মিলিয়ে এই স্তরের শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসে কাটানোর জন্য টানা ১৬ দিনের একটি বড় সুযোগ পাচ্ছে। বর্তমানের ভ্যাপসা গরমের মধ্যে এই ছুটি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ উপকারী হবে বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। এই সময়ে তারা যেমন বিশ্রাম পাবে, তেমনি ঈদের উৎসবের আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ করতে পারবে।
সাধারণ স্কুল-কলেজের তুলনায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা একটু বেশিই সৌভাগ্যবান। কারণ তারা এবার আরও দীর্ঘ ছুটি উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুসারে আলিয়া, দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল স্তরের সব মাদ্রাসায় ২৪ মে থেকে ছুটি শুরু হয়ে চলবে ১১ জুন পর্যন্ত। এরপর ১২ ও ১৩ জুন সাপ্তাহিক ছুটি কাটানোর পর ১৪ জুন রোববার থেকে তাদের নিয়মিত ক্লাস শুরু হবে। দিন গুনে হিসাব করলে দেখা যায়, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ দিনের একটি বিশাল ছুটি পাচ্ছে। মাদ্রাসার আবাসিক অনেক শিক্ষার্থী অনেক দূর থেকে পড়তে আসে, তাই তাদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য এই দীর্ঘ ছুটি বেশ কাজে দেবে। এই লম্বা সময়ে তারা ঈদের আনন্দ উপভোগ করার পাশাপাশি নিজেদের পড়াশোনার ঘাটতিও অনায়াসে পুষিয়ে নিতে পারবে।
এই লম্বা ছুটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, বরং সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনেও বড় প্রভাব ফেলে। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতিতে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের টিকিটের চাহিদা এখন তুঙ্গে। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই ছুটির সময়ে যাতায়াত ও কেনাকাটায় মানুষের খরচ গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫% থেকে ২০% বাড়তে পারে। পরিবহন ও পর্যটন খাতে এ সময় কয়েক মিলিয়ন ডলারের ($) বেশি লেনদেন হয়, যা দেশের অর্থনীতিকে দারুণভাবে সচল রাখে। কোরবানির পশুর হাটেও শিক্ষার্থীদের বেশ আগ্রহ থাকে, তারা বাবার সাথে গরু-ছাগল কিনতে যায়। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঢাকার রাস্তাঘাটে যানজটও অনেকটা কমে আসবে, ফলে চাকরিজীবী মানুষের যাতায়াতে অনেক সময় বাঁচবে।
জুন মাসে ছুটি শেষে স্কুল-কলেজ খুললেও জুলাই এবং আগস্ট মাসে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কিছু সরকারি ছুটি অপেক্ষা করছে। সংশোধিত শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, আগামী ২৯ জুলাই আষাঢ়ী পূর্ণিমা উপলক্ষে সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক দিনের ছুটি থাকবে। এরপর আগস্ট মাসে বেশ কয়েকটি ছুটি রয়েছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে, যা দেশের নতুন ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন। নতুন প্রজন্মের কাছে এই দিনের তাৎপর্য অনেক। এছাড়া ১২ আগস্ট আখেরি চাহার শোম্বা এবং ২৬ আগস্ট পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সেপ্টেম্বর মাসেও শুভ জন্মাষ্টমী ও ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে সরকারি ছুটি নির্ধারিত রয়েছে। তবে আপাতত সবার নজর আসন্ন ঈদুল আজহা ও গরমের এই টানা ছুটির দিকেই। শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকা স্কুল-কলেজগুলোর প্রাঙ্গণ আগামী কয়েক দিন একেবারে শান্ত থাকবে। গ্রামের বাড়িতে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে সবাই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবেন, রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না, এটাই সবার প্রত্যাশা। এই ছুটি শেষে শিক্ষার্থীরা নতুন উদ্যমে ও সতেজ মনে আবারও শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসবে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হবে।
















