শিক্ষাগত যোগ্যতায় ঘাটতি: ৪৪তম বিসিএস নন-ক্যাডারে ১০১ জনের চূড়ান্ত মনোনয়ন বাতিল করল পিএসসি

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় স্বপ্নের নাম বিসিএস। একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার আশায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু চূড়ান্ত ধাপে এসে যদি সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়, তবে তার চেয়ে বড় কষ্টের আর কিছু হতে পারে না। ঠিক এমন একটি কষ্টের খবরই আজ বুধবার দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসি। ৪৪তম বিসিএস পরীক্ষা-২০২১-এর নন-ক্যাডার পদে সুপারিশ পাওয়া ১০১ জন প্রার্থীর চূড়ান্ত মনোনয়ন বাতিল করেছে পিএসসি। শুধু তাই নয়, আরও সাতজন প্রার্থীর মনোনয়ন আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

আজ বুধবার পিএসসি একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি সারা দেশের মানুষের কাছে প্রকাশ করেছে। আমরা সবাই জানি, বিসিএস পরীক্ষার প্রক্রিয়াটি অনেক দীর্ঘ এবং জটিল। প্রিলিমিনারি, লিখিত এবং ভাইভা—এই তিনটি কঠিন ধাপ পার হয়ে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত সুপারিশ পান। এরপর শুরু হয় পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং কাগজপত্রের কড়া যাচাই-বাছাই। বিজ্ঞপ্তিতে পিএসসি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, বিসিএস পরীক্ষার সার্কুলার বা বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী ওই ১০১ জন প্রার্থীর প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতি বা কমতি ছিল।

বিষয়টি একটু সহজভাবে বললে দাঁড়ায়, আবেদন করার সময় প্রার্থীরা নিজেদের যে শিক্ষাগত যোগ্যতা দাবি করেছিলেন, চূড়ান্ত যাচাইয়ের সময় তারা সেই অনুযায়ী সঠিক কাগজপত্র জমা দিতে পারেননি। অনেকের হয়তো অনার্স বা মাস্টার্সের ফলাফলের তারিখে গড়মিল ছিল, আবার কেউ কেউ হয়তো নির্দিষ্ট পদের জন্য চাওয়া বিশেষ বিষয়ের ডিগ্রি ছাড়াই আবেদন করেছিলেন। পিএসসি সব সময় নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০০% স্বচ্ছতা বজায় রাখে। তাই বিজ্ঞপ্তির শর্ত না মেলায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য সুপারিশ পাওয়া এই ১০১ জন প্রার্থীর মনোনয়ন সরাসরি বাতিল করা হলো। এ ছাড়া কাগজপত্রে নানা জটিলতা এবং অস্পষ্টতার কারণে আরও সাতজন প্রার্থীর মনোনয়ন স্থগিত রেখেছে কমিশন। তাদের বিষয়ে পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পিএসসি আরও জানিয়েছে, যেসব প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও স্থগিত হয়েছে, তাদের সবার রোল নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য কমিশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রার্থীরা খুব সহজেই ওয়েবসাইটে গিয়ে এ–সংক্রান্ত মূল বিজ্ঞপ্তিটি দেখতে পারবেন এবং নিজেদের অবস্থা জানতে পারবেন।

এর আগে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ৪৪তম বিসিএসের নন-ক্যাডার পদের চূড়ান্ত ফলাফল ও মনোনয়ন তালিকা প্রকাশ করেছিল পিএসসি। সেই তালিকায় মেধার ভিত্তিতে মোট ২ হাজার ৯৬৮ জন প্রার্থীকে বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছিল। যারা বিসিএস পরীক্ষায় পাস করেন কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে ক্যাডার পদে সুযোগ পান না, তাদের মধ্য থেকে মেধার ভিত্তিতে নন-ক্যাডারে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। আজ ১০১ জনের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়ায় সেই সফল প্রার্থীদের তালিকা থেকে সংখ্যাটি কিছুটা কমল।

আমাদের দেশে একটি সরকারি চাকরির জন্য বেকার তরুণদের সংগ্রাম কতটা কঠিন, তা ভুক্তভোগীরাই সবচেয়ে ভালো জানেন। ঢাকায় একটি মেসে বা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে মাসে অনায়াসেই ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাবে এই টাকার পরিমাণ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ $ ডলারের সমান। একজন বেকার মানুষের জন্য প্রতি মাসে এত টাকা জোগাড় করা ভীষণ চাপের। এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে, হাজার হাজার প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে চূড়ান্ত মেধা তালিকায় জায়গা করে নেওয়ার পর শুধু সনদের ভুলে চাকরি হারানোটা সত্যিই এক বিশাল মানসিক আঘাত। এই ১০১ জন প্রার্থীর পরিবারে আজ যে চরম হতাশা নেমে এসেছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

পিএসসির এই কঠোর সিদ্ধান্ত আগামী দিনের বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশাল সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। অনেকেই মনে করেন প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আগে অনলাইনে ফরম পূরণের সময় ছোটখাটো ভুল হলে হয়তো পরে তা ঠিক করে নেওয়া যাবে। কিন্তু পিএসসি দেখিয়ে দিল যে, আইনের জায়গায় তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়। আবেদন করার সময় প্রার্থীর বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং অন্যান্য তথ্য ১০০% নির্ভুল হতে হবে। সামান্য একটি ভুলের কারণে কয়েক বছরের জমানো স্বপ্ন এক নিমিষেই শেষ হয়ে যেতে পারে।

সরকার এবং পিএসসি দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে যোগ্য ও সঠিক লোক নিয়োগ দিতে বদ্ধপরিকর। তাই যোগ্যতায় ঘাটতি থাকা কোনো প্রার্থীকেই তারা নিয়োগ দিতে চায় না। এই ঘটনার পর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাকরিপ্রার্থীরা নিজেদের কাগজপত্র ও তথ্য পূরণের ব্যাপারে আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি সতর্ক হবেন বলেই সবাই আশা করছেন।

সম্পর্কিত নিবন্ধ