টাকার অভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যায়। এই সমস্যা দূর করতে এবং গরিব পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে দারুণ এক সুখবর দিয়েছে সরকার। মাধ্যমিক ও সমমান পর্যায়ে অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে ভর্তি সহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত ১৪ মে থেকে অনলাইনে এই আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে। আগ্রহীরা আগামী ১৪ জুন ২০২৬ তারিখ রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত নিজেদের আবেদন জমা দিতে পারবেন।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট তাদের ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে থাকা দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ পাবে। তবে সবাইকে অবশ্যই নির্ধারিত সময়সূচি ও নির্দেশিকা মেনে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার জন্য ট্রাস্ট একটি নির্দিষ্ট ওয়েব লিংক দিয়েছে। ‘ই-ভর্তি সহায়তা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি’ নামের ওই লিংকে প্রবেশ করে অত্যন্ত সহজে শিক্ষার্থীরা নিজেদের তথ্য জমা দিতে পারবেন।
আমাদের দেশে নিম্ন আয়ের মানুষদের সংসার চালাতেই অনেক কষ্ট হয়। সেখানে ছেলেমেয়েদের খাতা, কলম ও স্কুলের বেতন দেওয়া তাদের জন্য বিশাল এক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই বিষয়টির কথা মাথায় রেখে সরকার আয়ের একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিয়েছে। আবেদনকারী শিক্ষার্থীর বাবা-মা বা অভিভাবকের বাৎসরিক আয় অবশ্যই তিন লাখ টাকা বা তার কম হতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাবে এই টাকার পরিমাণ বছরে প্রায় ২,৫০০$ (ডলার) এর কাছাকাছি। এর বেশি আয় হলে তারা এই সহায়তার জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় দেখা যায়, দারিদ্র্যের কারণে প্রায় ২০% থেকে ২৫% শিক্ষার্থী মাঝপথেই স্কুল ছেড়ে দেয়। সরকারের এই আর্থিক সহায়তা সেই ঝরে পড়ার হার কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ভর্তি সহায়তা পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মেধার প্রমাণ দিতে হবে। ‘আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি সহায়তা প্রদান নির্দেশিকা, ২০২৬’ অনুযায়ী বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শর্তটি হলো, আবেদনকারী শিক্ষার্থীকে অবশ্যই তার আগের শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় শতকরা ন্যূনতম ৬০% নম্বর পেতে হবে। আর যেসব স্কুলে গ্রেডিং পদ্ধতি চালু আছে, সেখানে জিপিএ ৫-এর মধ্যে কমপক্ষে ৩.৫০ পেতে হবে। অনলাইনে আবেদন করার সময় এই নম্বরপত্র বা রেজাল্ট শিটের কপি অবশ্যই আপলোড করতে হবে। এই নিয়মটি শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করতে উৎসাহ জোগাবে।
ট্রাস্টের পক্ষ থেকে সমাজের বেশ কিছু পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে এই সহায়তার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। যেমন এতিম শিক্ষার্থী, নিজে বা অভিভাবক শারীরিক প্রতিবন্ধী হলে, এবং দুরারোগ্য কোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকলে তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। পাশাপাশি অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, হতদরিদ্র শ্রমিক পরিবারের সন্তান এবং ‘জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫’ অনুযায়ী ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর সন্তানেরাও এই সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারবে। তবে এসব ক্ষেত্রে তাদের দাবির পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ বা সনদের স্ক্যান কপি অনলাইনে আবশ্যিকভাবে আপলোড করতে হবে।
আর্থিক অসচ্ছলতার প্রমাণ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে একটি সনদপত্র নিতে হবে। এরপর সেই সনদের কপি অনলাইনে জমা দিতে হবে। এর বাইরে আরও কিছু সাধারণ কাগজপত্র লাগবে। যেমন ট্রাস্টের নির্ধারিত ফরমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের একটি প্রত্যয়নপত্র, শিক্ষার্থীর জন্মনিবন্ধন সনদের কপি, বাবা ও মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) কপি এবং শিক্ষার্থীর এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি লাগবে। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, টাকা পাওয়ার জন্য শিক্ষার্থী অথবা তার বাবা-মায়ের সচল অনলাইন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যের স্পষ্ট কপি আপলোড করতে হবে।
এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই সরাসরি সহায়তার টাকা পৌঁছে যাবে। বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সুবিধা থাকায় গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও খুব সহজেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে, মাঝে কোনো দালাল বা তৃতীয় পক্ষ যেন গরিব শিক্ষার্থীদের এই টাকা আত্মসাৎ করতে না পারে। সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় ১০০% স্বচ্ছতা বজায় থাকে। এই ভর্তি সহায়তার টাকা পেয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের নতুন ক্লাসের ভর্তি ফি পরিশোধ, নতুন বই-খাতা কেনা, স্কুল ড্রেস বানানো এবং যাতায়াতের মতো জরুরি খরচগুলো মেটাতে পারবে।
বর্তমান যুগ পুরোপুরি ডিজিটাল। তাই পুরো কার্যক্রমটি অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। এর ফলে কাউকে আর কষ্ট করে আবেদনের কোনো হার্ড কপি বা কাগজের ফাইল অফিসে পাঠাতে হবে না। এতে সাধারণ মানুষের সময় এবং যাতায়াতের খরচ দুটোই বাঁচবে। এরপরও অনলাইনে আবেদন করতে গিয়ে কেউ যদি কোনো ধরনের সমস্যায় পড়েন, তবে তাদের সাহায্য করার জন্য সরকার কয়েকটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করেছে। অফিস চলাকালীন সময়ে, অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ০২-৫৫০০০৪২৮, ০১৭৭৮৯৫৮৩৫৬ এবং ০১৭৭৮৯৬৪১৫৬ নম্বরে ফোন করে যে কেউ সরাসরি সাহায্য নিতে পারবেন। সরকারের এই দারুণ উদ্যোগের ফলে হাজার হাজার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পথ আরও সহজ ও সুন্দর হবে।
















