খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email
কৃষিনির্ভর

মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে মৌলিক এবং প্রথম চাহিদা হলো খাদ্য। পেটে ক্ষুধা থাকলে মানুষের কাছে পৃথিবীর অন্য কোনো উন্নয়ন বা চাকচিক্যই অর্থবহ মনে হয় না। একটা সময় ছিল যখন আমাদের দেশ পরিচিত ছিল খাদ্যঘাটতির দেশ হিসেবে। কিন্তু কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনি আর কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশ আজ ধান বা চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের একটি বিষয়। তবে, বর্তমান বিশ্বের এবং আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার দিকে তাকালে একটি বড় শঙ্কা আমাদের মনে উঁকি দেয়। সামনের দিনগুলোতে কি আমরা আমাদের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত খাবারের জোগান ঠিক রাখতে পারব?

“খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে” এই প্রশ্নটি এখন আর শুধু সরকারি নীতিনির্ধারক বা গবেষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সাধারণ মানুষের চায়ের আড্ডারও অন্যতম প্রধান চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা দেখছি বাজারে জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বাড়ছে, কৃষিজমি চোখের সামনেই কমে যাচ্ছে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতি প্রতিনিয়ত তার বিরূপ রূপ দেখাচ্ছে। এই সব মিলিয়ে আমাদের ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা এক বিশাল হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আজকের এই নিবন্ধে আমরা সহজ ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করব, খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আসলে কী বোঝায় এবং এটি নিশ্চিত করার পথে আমাদের সামনে বর্তমানে ঠিক কী কী বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আসলে কী বোঝায়?

খাদ্য নিরাপত্তা বা ফুড সিকিউরিটি (Food Security) বলতে অনেকেই শুধু দেশে পর্যাপ্ত চাল বা গম উৎপাদন হওয়াকে বুঝে থাকেন। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি এত সহজ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) মতে, খাদ্য নিরাপত্তার মূলত চারটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে:

১. খাদ্যের সহজলভ্যতা (Availability): দেশে প্রয়োজনীয় পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন বা মজুত থাকতে হবে।
২. খাদ্য প্রাপ্তির ক্ষমতা (Accessibility): শুধু মজুত থাকলেই হবে না, সাধারণ মানুষের পকেটে সেই খাবার কেনার মতো টাকা বা সামর্থ্য থাকতে হবে।
৩. খাদ্যের ব্যবহার ও পুষ্টিগুণ (Utilization): খাবারটি শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং তা হতে হবে পুষ্টিকর এবং নিরাপদ।
৪. স্থিতিশীলতা (Stability): সারা বছর ধরে, এমনকি কোনো বড় দুর্যোগ বা অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও যেন উপরোক্ত তিনটি বিষয় ঠিক থাকে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

এই চারটি শর্ত যখন একসঙ্গে পূরণ হয়, তখনই একটি দেশে প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আর ঠিক এই জায়গাগুলোতেই বর্তমানে আমরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথটি বর্তমানে মোটেও মসৃণ নেই। আমাদের সামনে বেশ কিছু কাঠামোগত, প্রাকৃতিক এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে, যা মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতির বিরূপ আচরণ

আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার পথে বর্তমানে সবচেয়ে বড় অশনিসংকেত হলো জলবায়ু পরিবর্তন। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমনিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি বড় কেন্দ্র। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এই দুর্যোগের মাত্রা এখন অনেক বেড়ে গেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় আবাদি জমিতে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। লবণাক্ত জমিতে ধান বা অন্যান্য ফসল ফলানো প্রায় অসম্ভব।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলে দেখা দিচ্ছে তীব্র খরা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর মারাত্মকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। বর্ষাকালে দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির দেখা নেই, আবার অসময়ে এমন বৃষ্টি হচ্ছে যে হঠাৎ বন্যায় কৃষকের আধাপাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে প্রতি বছর আমাদের লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হচ্ছে। প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আচরণের কারণে কৃষকরা এখন আর আগের মতো নিশ্চিন্তে ফসল ফলাতে পারছেন না, যা ভবিষ্যতের খাদ্যভাণ্ডারের জন্য এক বড় হুমকি।

কৃষিজমি হ্রাস ও অপরিকল্পিত নগরায়ন

খাদ্য উৎপাদনের প্রধান কারখানাই হলো আবাদি জমি। কিন্তু আমাদের দেশে জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, আর সেই সাথে পাল্লা দিয়ে কমছে কৃষিজমি। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য নতুন বাড়িঘর তৈরি, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল এবং কলকারখানা বানানোর জন্য প্রতিনিয়ত কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে।

একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, গ্রামের যে মাঠে কয়েক বছর আগেও সবুজ ধানের ঢেউ খেলত, সেখানে আজ হয়তো সারি সারি ইটের ভাটা অথবা কোনো বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক শতাংশ হারে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। জমি যদি না থাকে, তবে আমরা ফসল ফলাব কোথায়? এত অল্প জমি থেকে এত বিশাল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য উৎপাদন করা আগামী দিনে এক প্রায় অসম্ভব কাজ হয়ে দাঁড়াবে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও আমদানি নির্ভরতা

আমরা চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও গম, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডাল এমনকি শিশুখাদ্যের জন্য আমরা ব্যাপকভাবে বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো অস্থিরতা তৈরি হয়, তখনই আমাদের দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, সার এবং গমের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। সেই সাথে দেশে দেখা দিয়েছে চরম ডলার সংকট। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে বিদেশ থেকে খাদ্যপণ্য আমদানি করতে আমাদের অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। বিশ্বায়নের এই যুগে অন্য দেশের যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকটের সরাসরি শিকার হচ্ছি আমরা। পরনির্ভরশীলতার এই জায়গাটি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি মারাত্মক চ্যালেঞ্জ।

কৃষিউপকরণের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ

একজন কৃষক যখন মাঠে ফসল ফলান, তখন তার বীজ, সার, কীটনাশক এবং সেচের জন্য ডিজেল বা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। গত কয়েক বছরে এই প্রতিটি কৃষিউপকরণের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করা এবং সেচ দেওয়ার খরচ অনেক বেড়ে গেছে।

পাশাপাশি, কৃষিশ্রমিকের মজুরি এখন অনেক চড়া। সব মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে ফসল ফলাতে কৃষকের যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, ফসল ওঠার পর তা বিক্রি করে অনেক সময় সেই আসল টাকাই ওঠে না। উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে কৃষিকাজ এখন আর লাভজনক পেশা হিসেবে থাকছে না। কৃষক যদি লাভ না করতে পারেন, তবে তিনি কেন কষ্ট করে ফসল ফলাবেন? কৃষকের এই হতাশা খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তিমূলে আঘাত করছে।

বাজার সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম শর্ত হলো মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য থাকা। কিন্তু আমাদের দেশের একটি অদ্ভুত সমস্যা হলো ‘বাজার সিন্ডিকেট’। কৃষক হয়তো তার ক্ষেতের একটি সবজি ১০ টাকায় বিক্রি করছেন, কিন্তু সেই সবজি কয়েক হাত ঘুরে শহরের মানুষের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দাম হয়ে যাচ্ছে ৫০ বা ৬০ টাকা।

মাঝখান থেকে একদল অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল কোনো কষ্ট না করেই বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তারা ইচ্ছেমতো বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চাল, পেঁয়াজ বা আলুর দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের পক্ষে বাজার থেকে পুষ্টিকর খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজারে পর্যাপ্ত খাবার থাকা সত্ত্বেও দামের কারণে মানুষ যখন তা কিনতে পারে না, তখন তাকেও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বলা হয়।

পুষ্টিহীনতা ও নিরাপদ খাদ্যের সংকট

শুধু পেট ভরে ভাত খেলেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলস থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমানে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের দাম এতটাই বেশি যে সাধারণ মানুষের প্লেট থেকে এগুলো প্রায় উধাও হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বাধ্য হয়ে শুধু শর্করা বা ভাত খেয়ে পেট ভরাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টির কারণ হচ্ছে।

এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে নিরাপদ খাদ্যের অভাব। খাবারে ফরমালিন, রাসায়নিক রং, কার্বাইড এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার আমাদের খাদ্যকে বিষে পরিণত করেছে। এই ভেজাল খাবারের কারণে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের মতো মারাত্মক রোগ ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। নিরাপদ খাদ্যের এই সংকট বর্তমানে এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে।

তরুণ প্রজন্মের কৃষিতে অনাগ্রহ ও শ্রমিক সংকট

বর্তমানে গ্রামের তরুণ প্রজন্ম আর কৃষিকাজে যুক্ত হতে চাইছে না। তারা মনে করে কৃষিকাজ মানেই রোদে পোড়া, বৃষ্টিতে ভেজা এবং সম্মানহীন একটি কাজ। তারা পড়াশোনা করে শহরে গিয়ে ছোটখাটো চাকরি করতে চায় অথবা প্রবাসে পাড়ি জমাতে চায়। এর ফলে গ্রামে কৃষিকাজের জন্য চরম শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে। বয়স্ক কৃষকরা যখন আর কাজ করতে পারবেন না, তখন এই কৃষির হাল কে ধরবে? দক্ষ ও আগ্রহী জনবলের এই অভাব কৃষিখাতের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলছে।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমাদের করণীয়

খাদ্য নিরাপত্তার এই পাহাড়সম চ্যালেঞ্জগুলো দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বেঁচে থাকতে হলে আমাদের এই বাধাগুলো টপকাতেই হবে। এজন্য রাষ্ট্র, কৃষক এবং সাধারণ নাগরিক—সবাইকে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীল কৃষির প্রসার

জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের কৃষিব্যবস্থাকেও আধুনিক করতে হবে। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীদের আরও বেশি গবেষণা করে এমন জাতের বীজ উদ্ভাবন করতে হবে, যা লবণাক্ত পানিতে, খরায় বা অতিরিক্ত জলমগ্ন অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি যেমন—কম্বাইন হারভেস্টার বা রাইস ট্রান্সপ্লান্টার-এর ব্যবহার বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিক সংকটের কারণে ফসল উৎপাদনে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।

কৃষিজমি রক্ষা ও পরিকল্পিত ব্যবহার

কৃষিজমি রক্ষায় সরকারকে অত্যন্ত কঠোর হতে হবে। যেখানে-সেখানে বাড়িঘর বা কলকারখানা বানানোর প্রবণতা বন্ধ করে ‘জোন’ বা নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক নগরায়ন ও শিল্পায়ন করতে হবে। কোনোভাবেই তিন বা দুই ফসলি জমিতে ইটভাটা বা শিল্পকারখানা করতে দেওয়া যাবে না। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় রাসায়নিক সারের পাশাপাশি জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে।

কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও বাজার নিয়ন্ত্রণ

কৃষক যাতে তার উৎপাদিত ফসলের সঠিক দাম পান, সে জন্য সমবায় ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষক যেন সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে। অসাধু সিন্ডিকেট ভাঙতে হলে প্রশাসনকে কঠোর হাতে বাজার মনিটরিং করতে হবে এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানি নির্ভরতা কমানো

ভোজ্যতেল বা গমের জন্য অন্য দেশের মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে দেশেই সরিষা, সূর্যমুখী, সয়াবিন বা গমের চাষ বাড়াতে কৃষকদের বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। পতিত জমিগুলো ফেলে না রেখে সেখানে শাকসবজি ও ফলমূল চাষের উদ্যোগ নিতে হবে।

নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা

খাদ্যে ভেজাল রোধে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। হাটে-বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে ভেজালকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের নিরাপদ মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন ও প্রশিক্ষিত করতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। আমরা আকাশে স্যাটেলাইট পাঠাতে পারি, বড় বড় সেতু বা মেট্রোরেল বানাতে পারি, কিন্তু দিন শেষে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্লেটে এক মুঠো ভাতের প্রয়োজন হয়। বর্তমান বাস্তবতায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে যে চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা অত্যন্ত জটিল এবং বহুমুখী। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষিজমি কমে যাওয়ার মতো প্রাকৃতিক ও কাঠামোগত সমস্যা, অন্যদিকে বাজার সিন্ডিকেট, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো অর্থনৈতিক সংকট আমাদের খাদ্যভাণ্ডারকে প্রতিনিয়ত চোখ রাঙাচ্ছে।

তবে, এই চ্যালেঞ্জ জয় করা অসম্ভব কিছু নয়। আমাদের দেশের কৃষকরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যেভাবে এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছেন, তাদের যদি সঠিক সম্মান, ন্যায্যমূল্য এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া যায়, তবে তারা যেকোনো সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম। খাদ্য নিরাপত্তাকে শুধু কৃষিমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না ভেবে, এটিকে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে হবে। কৃষিজমি রক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অসাধু বাজার ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে যদি আমরা একটি টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ক্ষুধামুক্ত, পুষ্টিকর ও নিরাপদ বাংলাদেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে, কৃষির পতন মানে পুরো জাতির পতন, আর কৃষির জয় মানেই এক নিশ্চিত ও সুরক্ষিত আগামীর জয়।


সম্পর্কিত নিবন্ধ