কুমিল্লায় ব্রাহ্মণপাড়া পুলিশের বিশেষ অভিযান: সিঁধেল চোর ও মাদকসেবীসহ গ্রেফতার ৬

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া থানা পুলিশ অপরাধ দমনে নিজেদের কঠোর ও আপসহীন অবস্থান আরও একবার জোরালোভাবে প্রমাণ করল। গত কয়েক দিনের টানা ও পৃথক বিশেষ অভিযানে পুলিশ বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ছয়জন অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে চারজনই দীর্ঘদিনের পলাতক বা পরোয়ানাভুক্ত আসামি। বাকি দুজনের মধ্যে একজনকে একটি নিয়মিত চুরির মামলায় এবং অন্যজনকে মাদক সেবনের দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও থানা-পুলিশ দাবি করছে, এই ধরনের সাঁড়াশি ও নিয়মিত অভিযানের ফলে এলাকায় অপরাধের হার আগের চেয়ে অন্তত ৪০% থেকে ৫০% কমে এসেছে। সাধারণ মানুষ পুলিশের এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে বেশ সাধুবাদ জানাচ্ছেন এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে এখন তারা অনেক বেশি আশাবাদী।

আমাদের সমাজে অপরাধীদের অবাধ বিচরণের কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। চুরি, মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলো স্থানীয় অর্থনীতির ওপর নীরব অথচ এক বিশাল নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ের এই অপরাধগুলো দমনে প্রশাসনকে প্রতি বছর প্রচুর অর্থ ও লোকবল খরচ করতে হয়। অনেক সময় এই খরচের পরিমাণ হাজার হাজার ডলার ($) বা লাখ লাখ টাকার সমপরিমাণ হয়ে দাঁড়ায়। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমাদের সমাজের প্রতিটি এলাকায় সংঘটিত ছোটখাটো অপরাধের প্রায় ৬০% থেকে ৭০% ঘটে থাকে শুধুমাত্র মাদকের কারণে। তাই ব্রাহ্মণপাড়া থানা পুলিশ নিজেদের এই চিরুনি অভিযানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিচালনা করছে, যাতে সমাজ থেকে অপরাধের শেকড় উপড়ে ফেলা যায়।

ব্রাহ্মণপাড়া থানা পুলিশের এই ধারাবাহিক অভিযানের বিস্তারিত তথ্য থেকে জানা যায়, উপপরিদর্শক বা এসআই সৈকত মজুমদার অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে একটি ওয়ারেন্ট তামিল অভিযান চালান। তিনি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জিআর পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি মো. এরশাদ আলীকে গ্রেফতার করেন। ২৯ বছর বয়সী এরশাদের বাবার নাম আবদুল খালেক। তার বাড়ি ব্রাহ্মণপাড়া থানার রামচন্দ্রপুর এলাকার উত্তর পাড়ায়, মালেক মিয়ার বাড়িতে। অন্যদিকে, সহকারী উপপরিদর্শক বা এএসআই আল-নুর আহসান আরেকটি পৃথক অভিযান চালিয়ে একই রামচন্দ্রপুর এলাকার মো. মাহাবুল আলমকে গ্রেফতার করেন। ৩২ বছর বয়সী মাহাবুলের বাবার নাম মৃত আ. রব্বান মিয়া। এরা দুজনই দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।

পুলিশের এই নিরলস ও ধারাবাহিক অভিযান শুধু এক জায়গাতেই থেমে থাকেনি। এএসআই মো. মুছা সম্পূর্ণ আলাদা ও সুপরিকল্পিত একটি অভিযান চালিয়ে সিআর পরোয়ানাভুক্ত আরেক পলাতক আসামি মো. ইসমাইল হোসেনকে গ্রেফতার করেন। ইসমাইলের বাবার নাম মৃত মো. হিরন মিয়া। তার বাড়ি ব্রাহ্মণপাড়া থানার ১নং মাধবপুর ইউনিয়নের মাধবপুর গ্রামে। এছাড়া এএসআই আল-নুর আহসান নিজের দ্বিতীয় সফল অভিযানে আরও একজন জিআর পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে পাকড়াও করতে সক্ষম হন। ২৮ বছর বয়সী এই আসামির নাম মো. মোসলেম উদ্দিন। তার বাবার নাম মৃত লিল মিয়া। মোসলেমের বাড়ি নাগাইশ গ্রামের গাঙ্গের পাড় জেলে বাড়িতে। পরোয়ানাভুক্ত এসব আসামিকে ধরতে পুলিশকে দিনের পর দিন সোর্স লাগিয়ে মাঠে কাজ করতে হয়েছে।

সমাজে সিঁধেল চুরি বা বাসাবাড়িতে গভীর রাতে চুরির ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে সব সময় তীব্র আতঙ্ক তৈরি করে। সাধারণ মানুষ অনেক কষ্ট করে নিজেদের সংসারের দরকারি জিনিসপত্র কেনেন। কিন্তু চোরেরা সুযোগ বুঝে মুহূর্তের মধ্যে সেই কষ্টার্জিত সম্পদ লুটে নিয়ে যায়। এই ধরনের একটি সিঁধেল চুরির মামলার আসামিকে ধরতে পুলিশ এবার বিশেষ নজর দেয়। ব্রাহ্মণপাড়া থানার মে মাসের ১৬ নম্বর মামলার প্রধান আসামি ছিল মো. রিমন। এসআই আল-আমিন অত্যন্ত চতুরতার সাথে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান চালিয়ে ২২ বছর বয়সী এই রিমনকে গ্রেফতার করেন। রিমনের বাবার নাম মো. সেলিম মিয়া এবং মায়ের নাম মনোয়ারা বেগম। তাদের বাড়ি সাহেবাবাদ এলাকার রেনু সর্দার বাড়িতে। পুলিশ এখন তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে চুরির অন্যান্য তথ্য ও মালামাল উদ্ধারের জোর চেষ্টা করছে।

সবশেষে, পুলিশের এই সাড়াঁশি অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপস্থিতিও ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। বর্তমান যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতির অংশ হিসেবে পুলিশ মাদক সেবনের অপরাধে এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে আটক করে এবং সাথে সাথে তাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করে। ৪৮ বছর বয়সী ওই অপরাধীর নাম সাদেক। তার বাবার নাম মৃত মতিউর রহমান এবং মায়ের নাম মৃত সাহানারা। সাদেকের বাড়ি চান্দলা এলাকার বড়ধুশিয়া গ্রামে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক অপরাধের সত্যতা ১০০% নিশ্চিত হওয়ার পর সাদেককে ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। পুলিশ কালক্ষেপণ না করে তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে।

ব্রাহ্মণপাড়া থানার পুলিশ কর্মকর্তারা অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তাদের এই বিশেষ অভিযান আগামী দিনেও একইভাবে অব্যাহত থাকবে। এলাকার সাধারণ মানুষকে শান্তিতে ঘুমাতে দিতে এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মাঠে থেকে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো অপরাধীই, সে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আইনের হাত থেকে কিছুতেই নিস্তার পাবে না। স্থানীয় বাসিন্দারা গভীরভাবে আশা করছেন, পুলিশের এই ১০০% পেশাদারিত্ব ও কঠোর নজরদারি বজায় থাকলে ব্রাহ্মণপাড়া এলাকা অচিরেই একটি সম্পূর্ণ অপরাধমুক্ত, নিরাপদ ও আদর্শ থানা হিসেবে সবার কাছে পরিচিতি লাভ করবে।

ব্রাহ্মণপাড়া থানা, পুলিশ অভিযান, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি, সিঁধেল চুরি, মাদক সেবন, ভ্রাম্যমাণ আদালত, গ্রেফতার, অপরাধ দমন, কুমিল্লা, আইন শৃঙ্খলা

সম্পর্কিত নিবন্ধ