গত জুলাই মাসে দেশের মানুষ একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যে ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান করেছিল, তার অন্যতম বড় কারণ ছিল ফ্যাসিবাদী ভয়ের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি। এই ভয়ের প্রধান জন্মস্থান ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস। সেখানে আবাসিক হলগুলোতে ‘গণরুম’ ও ‘গেস্টরুম’ সংস্কৃতির মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে ভিন্নমত দমন করা হতো। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, শেখ হাসিনার পতনের এত মাস পরও জুলাইয়ের সেই ঐক্য যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে। বর্তমানে ক্যাম্পাসে আবার নতুন করে নিপীড়ন ও ভয়ের সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর ফলে প্রতিরোধ গড়ার শক্তিও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
শনিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘অভ্যুত্থান-উত্তর বিশ্ববিদ্যালয়: সাম্প্রতিক বাস্তবতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এমন হতাশাজনক মূল্যায়ন তুলে ধরেছে। এই আলোচনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষক অংশ নেন। পাশাপাশি অনেক সাধারণ শিক্ষার্থীও তাদের মতামত জানান। তারা অভিযোগ করেন, জুলাইয়ে যে ক্যাম্পাসগুলো থেকে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, আজ সেখানেই নতুন করে মব জাস্টিস বা দলবদ্ধ হামলা ও নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আগের চেয়ে আরও বেশি সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে ক্যাম্পাসের অবস্থা মূল্যায়ন করে শিক্ষক নেটওয়ার্ক জানায়, ‘প্রেশার গ্রুপ’ নাম দিয়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নীতি-পুলিশিংয়ের মতো অনৈতিক কাজকে চরম প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এখন ছাত্র সংসদের নির্বাচিত কিছু প্রতিনিধি নতুন আক্রমণকারী শক্তি হিসেবে সামনে এসেছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিনদের জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হলেও প্রশাসন উল্টো ভুক্তভোগী নারীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিয়েছে। কুয়েটে (খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠনের কাছে খোদ প্রশাসন জিম্মি হয়ে পড়েছে, যে কারণে ৫ বার উপাচার্য বদল করেও সেখানে কোনো স্থিতিশীলতা আসেনি।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও আগের আমলের দুর্নীতি এবং অনিয়ম অব্যাহত আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য হিসেবে কাজ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বলেন, “নিপীড়ন শুধু শারীরিক নয়, শিক্ষক নিয়োগেও চরম নিপীড়ন আছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত পরীক্ষার নামে প্রহসন হয়েছে।” তিনি জানান, উপাচার্য পদগুলো বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে এবং তারা ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ আমলের চেয়েও খারাপভাবে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘যে যত বেশি জোর দেখাতে পারবে, মুল্লুক তার’—এই আদিম মানসিকতা ৫ আগস্টের পরও ক্যাম্পাসে রয়ে গেছে।
শিক্ষক নেটওয়ার্ক তাদের লিখিত বক্তব্যে আরও একটি উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করে। তারা জানায়, নির্বাচিত ছাত্র সংসদের কিছু নেতা ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, উদীচী এবং ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার ডাক দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সদস্যরা হকার উচ্ছেদের নামে সাধারণ হকার ও শিক্ষকদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছেন। তারা শাহবাগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ‘মব’ করে পেটানোর পর পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। এটি দেখে মনে হচ্ছে, ছাত্রলীগের আমলে শিবির সন্দেহে সাধারণ ছাত্রদের পেটানোর সেই পুরোনো চিত্রনাট্য আবার নতুন করে মঞ্চস্থ হচ্ছে।
শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এই মব জাস্টিসের হাত থেকে রক্ষা পাননি। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া-প্যাসিফিকে প্রগতিশীল শিক্ষকদের টার্গেট করে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিতে বাধ্য করা হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নির্ণয় ইসলাম জানান, যারা জুলাই আন্দোলনে সরাসরি সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, এখন তাদের বিরুদ্ধেই কতিপয় শিক্ষার্থী অযাচিত মব বা দলবদ্ধ আক্রমণ সৃষ্টি করছে। কিছু শিক্ষককে মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসির উদ্দিন আহমদ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের অভিযোগ করে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে একটি বিশেষ গোষ্ঠী, মূলত ছাত্রশিবির, ক্যাম্পাসে এককভাবে রাজনীতি করার জন্য মবের মাধ্যমে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করছে। আলোচনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা তার সমাপনী বক্তব্যে বলেন, “গত ২০-২১ মাসে দেশে এক যথেচ্ছাচারের রাজত্ব দেখা গেছে। একদিকে ছাত্রদের মবের ভয়, অন্যদিকে প্রশাসনের হয়রানির ভয়। মব এখন একটি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা ক্ষমতা দখলকারী বা ক্ষমতালোভীরা নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ভয়ের সংস্কৃতি জারি থাকলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে, যা দেশের জন্য বড় অশনিসংকেত।
















