বিশ্বকাপ ফুটবল এবং ব্রাজিল—শব্দ দুটি যেন বিশ্বজুড়ে একে অপরের পরিপূরক। আর আমাদের বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজিলের খেলা মানেই এক অন্য রকম আবেগ ও উন্মাদনা। টুর্নামেন্ট শুরু হলে পুরো ব্রাজিল দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের আনাচকানাচেও হলুদ জার্সির জোয়ার বয়ে যায়। দলটির মানুষদের কাছে বিশ্বকাপের চেয়ে বড় কোনো উৎসব নেই। যাঁরা সেই হলুদ জার্সি গায়ে বিশ্বকাপে দেশের হয়ে মাঠে নামেন, তাঁদের কাছে এটি জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো একটি ঘটনা।
তবে সবার কপালে সেই স্বপ্নের পূর্ণতা জোটে না। অনেক খেলোয়াড় বছরের পর বছর পরিশ্রম করে দলে সুযোগ পান, কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে বড় কোনো চোট তাঁদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়। আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপেও ঠিক এমন হৃদয়বিদারক ঘটনাই ঘটতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপ ঘিরে শক্তিশালী দলগুলো নিজেদের গুছিয়ে নিলেও, চোটের কারণে এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দলের নাম ব্রাজিল। হেক্সা বা ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের মিশনে নামার আগে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এখন অন্য কোনো দল নয়, বরং খেলোয়াড়দের এই চোট সমস্যা।
ইতিমধ্যে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও তারকা খেলোয়াড় চোট এবং ফিটনেস সমস্যায় মূল দল থেকে ছিটকে গেছেন। আবার কয়েকজন আছেন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল থেকে যাঁরা ইতিমধ্যে বাদ পড়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্তত তিনটি বড় নাম রয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের নিয়মিত মুখ রদ্রিগো এবং এদের মিলিতাও মারাত্মক চোটের কারণে মাঠে নামতে পারছেন না। এই দুজনই নিজ নিজ পজিশনে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা তারকা। দলের কোচ কার্লো আনচেলত্তির গুডবুকে তাঁদের নাম সবার ওপরেই ছিল। এই দুজনের শূন্যস্থান পূরণ করা আনচেলত্তির জন্য রীতিমতো এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই তালিকায় থাকা আরেকটি বড় ও চমকপ্রদ নাম হলো এস্তেভাও। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসির এই তরুণ উইঙ্গারকে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত মুখ হিসেবে বিবেচনা করছিলেন ফুটবল বিশ্লেষকেরা। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আনচেলত্তি মূলত এই তরুণকে বিশ্বকাপের জন্যই তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। কোচের আস্থার প্রতিদানও দিচ্ছিলেন তিনি। আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের হয়ে মাত্র ৭ ম্যাচ খেলে ৫টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে আরও ৫টি গোল করিয়েছেন এস্তেভাও। ইতালিয়ান এই কোচের অধীনে ব্রাজিলের আর কোনো ফুটবলার এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি। তাঁর খেলার মধ্যে চিরায়ত সেই ব্রাজিলিয়ান সাম্বা ফুটবলের জাদুকরী সৌন্দর্য মিশে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পাওয়ায় এস্তেভাও শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের প্রাথমিক দলেই জায়গা করে নিতে পারলেন না।
মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে এস্তেভাওকে হারানোর কারণে আনচেলত্তি নিশ্চিতভাবেই বড় বিপাকে পড়বেন। এই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় তারকা নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন সংশয়। ফিটনেস সমস্যার কারণে তিনি এখনো ১০০% নিশ্চিত নন। শেষ মুহূর্তের চমক হিসেবে নেইমার যদি বিশ্বকাপ দলে জায়গাও পান, তবুও তাঁর পুরোনো চোটপ্রবণতা কোচ ও ভক্তদের সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় রাখবে। ২০১৪ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মারাত্মক চোটে পড়ে এই তারকা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন, যার চরম মাশুল ব্রাজিলকে সেমিফাইনালে দিতে হয়েছিল।
বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার বড় দলগুলোর পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, ব্রাজিলের মতো এতটা ভয়ংকর ধাক্কা আর কেউ খায়নি। তবে ব্রাজিলের পর স্পেনের অবস্থাও কিছুটা খারাপ। বিশ্বকাপের ঠিক আগে চোটের কবলে পড়েছেন স্প্যানিশ দলের দুই দুর্দান্ত উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস ও লামিনে ইয়ামাল। যদিও চিকিৎসকেরা আশা করছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা হয়তো মাঠে ফিরতে পারবেন। কিন্তু এফসি পোর্তোর ২২ বছর বয়সী তরুণ ফরোয়ার্ড সামু ওমোরোদিয়নকে নিশ্চিতভাবেই মিস করবেন স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো শীর্ষ দলগুলোও বিশ্বকাপের আগে চোট সমস্যায় পড়েছে, তবে ব্রাজিলের তুলনায় তাদের ক্ষতির পরিমাণ বেশ কম। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রান্স তাদের প্রতিভাবান খেলোয়াড় হুগো একিতিকেকে হারিয়েছে। অন্যদিকে জার্মানির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে ফরোয়ার্ড সার্জ নাবরির অনুপস্থিতি। এগুলো অবশ্যই দলের জন্য বড় ক্ষতি। কিন্তু ইউরোপের এই দলগুলোর স্কোয়াডে দারুণ গভীরতা রয়েছে। তাদের বেঞ্চে কোটি কোটি ডলার ($) মূল্যের একাধিক মানসম্মত খেলোয়াড় বসে আছেন। ফলে তারা খুব সহজেই এই শূন্যস্থান পূরণ করে নিতে পারবে।
লাতিন আমেরিকার আরেক পরাশক্তি ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার শিবির থেকেও ফ্রাঙ্কো পানিচেল্লি ও হুয়ান ফয়েথ বাদ পড়েছেন। বিশেষ করে ফয়েথের জন্য এটি একটি বড় মানসিক ধাক্কা, কারণ এর আগে ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও তিনি চোটের কারণে খেলতে পারেননি। তবে এই দুজনের অনুপস্থিতি দল হিসেবে লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনার জন্য মাঠে খুব একটা বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, অন্যান্য দলে দু-একজন খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও ব্রাজিলের মতো মূল একাদশের এতজন তারকা একসঙ্গে হারানোর ধাক্কা কেউই খায়নি। তাই কোচ আনচেলত্তি এবং কোটি কোটি ভক্তের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপটি শুরু হওয়ার আগেই এক বিশাল চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
















