গতকাল রোববার রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভা’ অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় দীর্ঘদিনের বঞ্চনার শিকার পুলিশ বাহিনীর জন্য বেশ কিছু যুগান্তকারী সুখবর দিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার জন্য ওভারটাইম ভাতা, অবসরের সময় সম্মানসূচক পদোন্নতি এবং হাসপাতাল আধুনিকায়নের মতো অত্যন্ত যৌক্তিক দাবিগুলো সরকার ধাপে ধাপে পূরণ করবে। এই মহতী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের সার্বিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা মাথায় রেখে পুলিশের মোট বাজেট ধাপে ধাপে অন্তত ১০% থেকে ১৫% বাড়িয়ে এসব সুবিধা নিশ্চিত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে প্রশাসন।
পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মনের ভেতরে একটি বড় আক্ষেপ সব সময় কাজ করে, আর তা হলো সঠিক সময়ে পদোন্নতি না পাওয়া। অনেক পুলিশ কনস্টেবল দেশ ও জনগণের সেবায় টানা ৩০ থেকে ৪০ বছর একটানা অমানবিক পরিশ্রম করে চাকরি করেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, অবসরে যাওয়ার শেষ দিনটিতেও তারা সেই সাধারণ কনস্টেবল পদ নিয়েই বিদায় নেন। তাদের এই দীর্ঘদিনের হতাশা দূর করতে সরকার এবার একটি বিশেষ নীতিমালা তৈরি করছে। নতুন এই চমৎকার নিয়ম অনুযায়ী, অবসরে যাওয়ার ঠিক আগে ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক সদস্যকে সম্মানসূচক বা অনারারি পদোন্নতি দেওয়া হবে। এর ফলে একজন কনস্টেবল অবসরের সময় অনারারি এএসআই, একজন এএসআই অনারারি এসআই এবং একজন এসআই অনারারি পরিদর্শক বা ইন্সপেক্টর পদে উন্নীত হওয়ার অভাবনীয় সুযোগ পাবেন। এটি সমাজে তাদের সম্মান ও মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশের ডিউটির আসলে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা রুটিন থাকে না। বিশেষ দিনগুলোতে বা জরুরি প্রয়োজনে তাদের দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টাও একটানা কাজ করতে হয়। অতিরিক্ত এই অমানবিক কর্মঘণ্টার জন্য এতদিন তাদের কোনো নির্দিষ্ট আর্থিক সুবিধা বা ইনসেনটিভ ছিল না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সবাইকে আশ্বস্ত করে নিশ্চিত করেছেন যে, পুলিশ পরিদর্শক থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত মাঠপর্যায়ের সবাইকে ওভারটাইম বা অতিরিক্ত ডিউটি ভাতার আওতায় আনার বিষয়টি সরকার জোরালোভাবে বিবেচনা করছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই পুলিশ অতিরিক্ত ডিউটি করলে প্রতি ঘণ্টার জন্য ২০
থেকে৫০
(ডলার) পর্যন্ত ওভারটাইম পেয়ে থাকে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় টাকার অঙ্ক হয়তো ততটা হবে না, তবে এই ভাতার ব্যবস্থা চালু হলে পুলিশ সদস্যদের কাজের প্রতি মনোবল শতভাগ (১০০%) বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষ আরও অনেক বেশি আন্তরিক সেবা পাবে।
সারা দিন রাস্তায় টানা ডিউটি ও কাজের এই প্রচণ্ড বাড়তি চাপের কারণে পুলিশ সদস্যরা খুব সহজেই বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক অবসাদে ভোগেন। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও কল্যাণ সভায় বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের সুচিকিৎসা পুরোপুরি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে ঢেলে সাজানো হবে। প্রয়োজনে বড় বাজেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের নতুন হাসপাতালও নির্মাণ করা হবে। একই সাথে পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘদিনের প্রকট আবাসন সংকট দূর করতে নতুন বহুতল ভবন ও আধুনিক কার্যালয় নির্মাণের কাজ সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। এ জন্য দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ করে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার কাজ চলছে।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গত দুই মাসে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবে শুধু এইটুকু অর্জন নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক ও নিরাপদ করতে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের বিশেষ সাঁড়াশি অভিযান সারা দেশে চলমান রয়েছে। এর পাশাপাশি তিনি প্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার নিয়ে পুলিশকে সতর্ক করেন। তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় বিকাশের সাথে সাথে অপরাধীরা এখন অনেক বেশি চালাক হয়ে গেছে। তারা ঘরে বসেই নিত্যনতুন সাইবার ক্রাইম করছে। এসব প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ শক্ত হাতে দমন করতে হলে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের আধুনিক ও উন্নত প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং প্রতিনিয়ত নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
বর্তমানে আমাদের সমাজে বেশ কিছু নতুন অপরাধ খুব বাজেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এর মধ্যে অবৈধ অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম এবং মানি লন্ডারিং অন্যতম বড় সমস্যা। এসব অপরাধীরা খুব সহজেই দেশ থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ($) বিদেশে পাচার করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এসব আধুনিক অপরাধ প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের বর্তমান পুরোনো আইনগুলো মোটেও যথেষ্ট নয়। তাই যুগোপযোগী একটি নতুন ও কঠোর আইন তৈরির জন্য সরকার ইতিমধ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এছাড়া রাস্তায় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা মব কালচার আমাদের সমাজের জন্য একটি বড় ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অরাজকতা চিরতরে বন্ধ করতে সরকার বিদ্যমান আইন সংশোধন করে আরও কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করবে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উপস্থিত সকল পুলিশ সদস্যকে দেশপ্রেম ও চরম সততার সাথে কাজ করার কড়া নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লেই সবার আগে পুলিশের কাছে ছুটে আসে ন্যায়ের আশায়। তাই জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পুলিশকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে হবে। এই গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণ সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের বর্তমান মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির এবং অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলাম। সবার এমন সম্মিলিত ও আন্তরিক চেষ্টায় বাংলাদেশ পুলিশ খুব দ্রুত একটি সত্যিকারের জনবান্ধব ও বিশ্বমানের বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠবে বলে সবাই দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন।
















