বলিউডের রঙিন ও ঝলমলে পর্দার বাইরের আসল রূপ কেমন? ঠিক কতটা কঠিন এই জগতের ভেতরের পরিবেশ? এবার সেই কঠিন বাস্তবতাই সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরলেন পরিচিত মুখ অভিনেত্রী নওহিদ সাইরুসি। ‘আনওয়ার’ সিনেমার মাধ্যমে রাতারাতি আলোচনায় আসা এই মিষ্টি চেহারার অভিনেত্রীকে অনেক দিন ধরেই বড় পর্দায় আর দেখা যাচ্ছিল না। দর্শক ও ভক্তরা প্রায়ই তাকে প্রশ্ন করতেন, কেন তিনি নতুন কোনো সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে কাজ করছেন না? দীর্ঘদিন চুপ থাকার পর অবশেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলেছেন তিনি।
সম্প্রতি নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা একটি বিস্তারিত ভিডিওতে নওহিদ সাইরুসি তার না বলা কথাগুলো প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার কিছু অলিখিত এবং অঘোষিত শর্ত রয়েছে, যেগুলো একজন শিল্পীকে মানসিকভাবে অনেক চাপে ফেলে দেয়। আর এই চাপ এবং শর্তগুলোই তাকে ধীরে ধীরে অভিনয় জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করা অনেক সময় বেশ অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায় বলে তিনি মনে করেন।
নওহিদ অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাহসী ভাষায় বলেন, বর্তমানে বলিউডে বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অভিনয়ের চুক্তিতে সই করা মানেই হলো একজন অভিনেত্রীকে যেকোনো ঘনিষ্ঠ দৃশ্য বা চুম্বন দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য শতভাগ (১০০%) রাজি থাকতে হবে। তার অভিযোগ, অনেক সময় সিনেমার মূল গল্প বা চিত্রনাট্যে এ ধরনের কোনো দৃশ্যের একেবারেই প্রয়োজন থাকে না। কিন্তু শুধুমাত্র দর্শক টানার জন্য বা সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় জোর করে অকারণে এসব দৃশ্য ঢোকানো হয়। নওহিদ বলেন, “আমি এই ধরনের অকারণ ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করতে একেবারেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। আর আমার এই না বলার কারণেই আমাকে অনেক বড় বড় প্রজেক্ট থেকে সরাসরি বাদ পড়তে হয়েছে।”
শুধু অভিনয়ের অস্বস্তিকর শর্তই নয়, বলিউডের অর্থনৈতিক শোষণের দিকটিও নওহিদ সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, অনেক নামিদামি প্রযোজকও চুক্তির শর্ত ঠিকমতো মানেন না এবং শিল্পীদের তাদের পাওনা পুরো পারিশ্রমিক পরিশোধ করেন না। তিনি বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পুরো সিনেমার শুটিং ঠিকঠাক শেষ হওয়ার পর চুক্তির প্রায় ২৫% টাকা প্রযোজকরা আটকে রাখেন। এরপর নানা খোঁড়া অজুহাত দেওয়া হয়। কখনো বলা হয় সিনেমা বক্স অফিসে ভালো ব্যবসা করতে পারেনি, আবার কখনো বলা হয় বাজেট শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমি তো আমার পুরো পরিশ্রম দিয়ে কাজটা ঠিকই করেছি। তাহলে আমার পাওনা টাকা কেন আটকে রাখা হবে? এই টাকা না পেলে একজন সাধারণ শিল্পী কার কাছে গিয়ে বিচার চাইবে?”
বলিউডের ভেতরের গ্রুপিং বা স্বজনপ্রীতির কথাও উঠে আসে নওহিদের কথায়। তিনি জানান, তিনি কখনোই ইন্ডাস্ট্রির তথাকথিত ‘ইনার সার্কেল’ বা প্রভাবশালী নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর অংশ হতে পারেননি। বড় বড় প্রযোজক বা শীর্ষ অভিনেতাদের সাথে রাতের পার্টিতে মেলামেশা বা চাটুকারিতা না করার কারণে তিনি অনেক ভালো কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এর ফলে তাকে সবসময় সিনেমার মূল চরিত্রে না নিয়ে ছোটখাটো চরিত্রে—যেমন নায়কের বোন বা নায়িকার ভাবির ভূমিকায়—কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হতো। কিন্তু নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রতি সম্মান রেখেই তিনি এসব অবহেলিত চরিত্র করতে রাজি হননি।
সিনেমা জগৎ থেকে দূরে সরে এলেও নওহিদ কিন্তু নিজের সৃজনশীলতা থামিয়ে রাখেননি। বরং তিনি এখন সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের এক নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছেন। ইনস্টাগ্রামে একজন সফল ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে তার জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করে তিনি এখন মাসে হাজার হাজার ডলার ($) আয় করছেন এবং আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবনযাপন করছেন। নওহিদ হাসিমুখে বলেন, “আমি এখন খুব ভালোভাবে বুঝেছি, ইনস্টাগ্রামই আমার জন্য সবচেয়ে সঠিক ও নিরাপদ জায়গা। এখানে কেউ আমাকে শর্ত দেয় না। এখানে আমি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেকে নিজের মতো করে প্রকাশ করতে পারি এবং ভক্তদের সরাসরি ভালোবাসা পাই।”
















