ঝিনাইদহে নারীদের স্বনির্ভরতায় এনজিওগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী ও কৃষিনির্ভর জেলা হলো ঝিনাইদহ। একসময় এই জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। নারীদের জীবন বলতে বোঝানো হতো কেবল ঘরের চারদেয়ালের ভেতরের কাজ, সন্তান লালন-পালন আর পরিবারের সবার সেবাযত্ন করা। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের কোনো দৃশ্যমান অংশগ্রহণ ছিল না, আর থাকলেও তার কোনো মূল্যায়ন হতো না। নিজের প্রয়োজন বা ইচ্ছার কথা বলার মতো সাহস বা সুযোগ কোনোটাই তাদের ছিল না। অভাব-অনটন, বাল্যবিবাহ আর পারিবারিক নির্যাতনের মতো বিষয়গুলো ছিল তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। ঝিনাইদহের গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটলে এখন দেখা যায় নারীরা আর শুধু ঘরের কাজে সীমাবদ্ধ নেই। তারা সেলাই মেশিনে কাপড় বুনছেন, গবাদিপশুর খামার চালাচ্ছেন, কুটির শিল্পের কাজ করছেন এবং অনেকেই ছোটখাটো ব্যবসা পরিচালনা করে নিজেদের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন। এই যে অবহেলিত ও ঘরবন্দী নারীদের একজন স্বনির্ভর এবং আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার রূপান্তর, এটি এক দিনে বা জাদুর ছোঁয়ায় হয়নি। সরকারের পাশাপাশি এই অভাবনীয় পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও (NGO)। বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঝিনাইদহ জেলায় নারীদের স্বনির্ভরতা অর্জনে এনজিওগুলো ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, কীভাবে তারা নারীদের জীবন বদলে দিচ্ছে এবং এই পথে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে—তা নিয়ে আজ একটি বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করা হলো।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

ঝিনাইদহের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও নারীদের অতীত অবস্থা

ঝিনাইদহ মূলত একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল। এখানকার বেশিরভাগ মানুষের জীবন ও জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আজ থেকে দুই দশক আগেও এখানকার আর্থসামাজিক অবস্থা খুব একটা উন্নত ছিল না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীদের বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করাকে খুব একটা ভালো চোখে দেখা হতো না।

পরিবারে পুরুষরাই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে পরিবারের যেকোনো সিদ্ধান্তে পুরুষের কথাই ছিল শেষ কথা। একজন নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, তখন তার নিজের কোনো স্বাধীনতা থাকে না। অভাবের সংসারে মেয়েদের বোঝাস্বরূপ মনে করা হতো, যার ফলে খুব অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ছিল চরম। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে গিয়েও আর্থিক পরনির্ভরশীলতার কারণে অনেক নারীকে মুখ বুজে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হতো। সমাজের এই অন্ধকার ও স্থবির অবস্থা থেকে নারীদের বের করে আনা ছিল অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। আর ঠিক এই কঠিন কাজটিই সহজ করার জন্য ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রামে কাজ শুরু করে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বেশ কিছু এনজিও।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

নারীদের স্বনির্ভর করতে এনজিওগুলোর বহুমুখী উদ্যোগ

এনজিওগুলো বুঝতে পেরেছিল যে, একজন নারীকে যদি সমাজের মূল স্রোতে আনতে হয় এবং তাকে সম্মানজনক অবস্থানে নিতে হয়, তবে সবার আগে তাকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। পকেটে নিজের উপার্জিত টাকা থাকলে একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস এমনিতেই বেড়ে যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এনজিওগুলো বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

ক্ষুদ্রঋণ ও মূলধনের সহজ জোগান

নারীদের স্বনির্ভর হওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল মূলধন বা টাকার অভাব। একজন নারী যদি একটি ছোট ব্যবসাও শুরু করতে চান, তার জন্য প্রাথমিক কিছু টাকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাধারণ ব্যাংকগুলো কোনো জামানত বা বন্ধক ছাড়া ঋণ দেয় না। গ্রামের দরিদ্র নারীদের পক্ষে কোনো জামানত দেওয়া সম্ভব ছিল না। এই শূন্যস্থানটি পূরণ করে এনজিওগুলো। তারা নারীদের দল বা সমিতি গঠন করে বিনা জামানতে ক্ষুদ্রঋণ (Microcredit) দেওয়া শুরু করে। পাঁচ হাজার, দশ হাজার বা বিশ হাজার টাকার এই ছোট ছোট ঋণ নিয়ে নারীরা হাঁস-মুরগি পালন, গাভী পালন, মুদি দোকান বা সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। এই সহজ শর্তের ঋণই নারীদের স্বনির্ভরতার প্রথম ও সবচেয়ে বড় সিঁড়ি হিসেবে কাজ করেছে।

বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন

শুধু টাকা দিলেই তো হবে না, সেই টাকা কীভাবে কাজে লাগিয়ে আয় করা যায়, তার জন্য দরকার দক্ষতা বা স্কিল। এনজিওগুলো নারীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। ঝিনাইদহের বিভিন্ন গ্রামে এনজিওর কর্মীরা গিয়ে নারীদের সেলাই কাজ, হাতের কাজ, নকশীকাঁথা তৈরি, বুটিক ও বাটিকের কাজ, এবং হস্তশিল্পের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন। এছাড়া আচার তৈরি, মাশরুম চাষ বা মোমবাতি তৈরির মতো ছোট ছোট কিন্তু লাভজনক কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণের ফলে অদক্ষ নারীরা দক্ষ কর্মীতে পরিণত হন এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যের মান অনেক ভালো হয়।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

কৃষি ও গবাদিপশু পালনে সহায়তা

যেহেতু ঝিনাইদহ কৃষিনির্ভর এলাকা, তাই কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালনে নারীদের যুক্ত করার সুযোগ ছিল অনেক বেশি। বিশেষ করে ঝিনাইদহ অঞ্চলে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ বা কালো ছাগলের ব্যাপক পরিচিতি ও চাহিদা রয়েছে। এনজিওগুলো নারীদের ছাগল পালন, হাঁস-মুরগির খামার তৈরি এবং গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসে। শুধু ঋণ নয়, গবাদিপশুর রোগবালাই প্রতিরোধে টিকাদান এবং আধুনিক পদ্ধতিতে খামার পরিচালনার বৈজ্ঞানিক কৌশলও এনজিও কর্মীরা নারীদের শিখিয়ে দেন। বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ বা ‘কিচেন গার্ডেনিং’ করেও অনেক নারী আজ নিজেদের পরিবারের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।

স্বাস্থ্য সচেতনতা ও অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা

এনজিওগুলো শুধু নারীদের আর্থিক উন্নয়নের কাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তারা নারীদের মানসিক বিকাশ ও সচেতনতা বৃদ্ধিতেও বিশাল ভূমিকা রেখেছে। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য, মাতৃকালীন যত্ন, শিশুদের পুষ্টি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতন করা হয়। এর পাশাপাশি নারীদের আইনি অধিকার, দেনমোহর, তালাক, এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। এতে করে নারীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস অর্জন করেন।

স্বনির্ভরতার দৃশ্যমান প্রভাব: বদলে যাওয়া জীবন ও সমাজ

এনজিওগুলোর এই নিরলস প্রচেষ্টার ফলে ঝিনাইদহের নারীদের জীবনে এবং সামগ্রিক সমাজব্যবস্থায় এক অভাবনীয় ও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ

আগে সংসারে নারীদের মতামতের কোনো মূল্য ছিল না। কিন্তু এখন যখন একজন নারী মাস শেষে নিজের আয়ের টাকা পরিবারের খরচে যুক্ত করছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার সম্মান ও কদর বেড়েছে। সন্তানকে কোন স্কুলে পড়ানো হবে, ঘরের টিন কবে বদলানো হবে বা মেয়ের বিয়ে কবে দেওয়া হবে—এসব গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক সিদ্ধান্তে এখন নারীদের মতামতকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নারীদের পরিবারে এক নতুন মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।

সন্তানদের শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ

একজন মা যখন নিজের হাতে টাকা উপার্জন করেন, তখন তিনি সেই টাকার বেশিরভাগই খরচ করেন তার সন্তানদের মঙ্গলের জন্য। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বনির্ভর নারীরা তাদের সন্তানদের, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের পড়াশোনার প্রতি অনেক বেশি যত্নশীল। আগে যেখানে টাকার অভাবে ছেলেরা স্কুলে গেলেও মেয়েরা যেতে পারত না, সেখানে আজ এনজিওর সাথে যুক্ত নারীদের সন্তানেরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। সন্তানদের পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই নারীরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম হয়েছেন।

বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন হ্রাস

নারীরা স্বনির্ভর হওয়ার কারণে সমাজে বাল্যবিবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। মায়েরা এখন বোঝেন যে, মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে না দিয়ে তাদের পড়াশোনা করানো এবং স্বাবলম্বী করা কতটা জরুরি। এছাড়া, পারিবারিক নির্যাতনের মাত্রাও অনেক কমেছে। কারণ, একজন আত্মবিশ্বাসী ও উপার্জনক্ষম নারী আর মুখ বুজে নির্যাতন সহ্য করেন না। তারা প্রতিবাদ করতে শিখেছেন এবং আইনি সহায়তা নেওয়ার সাহস পেয়েছেন।

পথচলার বাধা ও বর্তমান চ্যালেঞ্জসমূহ

এনজিওগুলোর এই কার্যক্রম ঝিনাইদহের নারীদের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এলেও, এই পথচলা একেবারেই কুসুমারস্তীর্ণ নয়। মাঠপর্যায়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের পথে নারীদের এবং এনজিওগুলোকে বেশ কিছু বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সামাজিক ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বাধা

সমাজ যত আধুনিকই হোক না কেন, এখনো অনেক গ্রামের পুরুষরা চান না তাদের স্ত্রী বা কন্যারা বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করুক বা এনজিওর মিটিংয়ে যোগ দিক। অনেক পরিবারে দেখা যায়, স্ত্রী এনজিও থেকে নিজের নামে ঋণ নিলেও সেই ঋণের পুরো টাকাটাই স্বামী তার নিজের কাজে বা ব্যবসায় লাগিয়ে দিচ্ছেন। ফলে নারী ঋণগ্রহীতা হয়েও টাকার কোনো নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকছে না। স্বামী ব্যবসায় লোকসান করলে কিস্তির টাকা জোগাড় করার মানসিক ও শারীরিক চাপ শেষ পর্যন্ত ওই নারীর ওপরই এসে পড়ছে।

ঋণের কিস্তির চাপ ও চড়া সুদ

এনজিওগুলোর ঋণের সুদ অনেক সময় সাধারণ ব্যাংকের তুলনায় বেশি হয়। প্রতি সপ্তাহে বা মাসে কিস্তি পরিশোধের একটি কড়া নিয়ম থাকে। অনেক সময় ব্যবসায় লোকসান হলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে বা গবাদিপশু মারা গেলে নারীরা কিস্তির টাকা জোগাড় করতে চরম বিপাকে পড়েন। একটি এনজিওর কিস্তি শোধ করতে গিয়ে তারা অনেক সময় অন্য এনজিও থেকে বা চড়া সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেন। ফলে তারা ঋণের এক ভয়ংকর দুষ্টচক্রে আটকে যান, যা তাদের মানসিক শান্তির চরম ব্যাঘাত ঘটায়।

উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য ও বাজারের অভাব

নারীরা হয়তো খুব সুন্দর নকশীকাঁথা তৈরি করছেন বা ভালো মানের আচার বানাচ্ছেন, কিন্তু সেই পণ্যগুলো সঠিক দামে বিক্রি করার জন্য ভালো কোনো বাজার বা প্ল্যাটফর্ম গ্রামে থাকে না। মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নারীদের কাছ থেকে পানির দরে পণ্য কিনে শহরের বড় বড় শোরুমে চড়া দামে বিক্রি করে বিশাল মুনাফা লুটছে। আধুনিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা বা ই-কমার্স সম্পর্কে গ্রামের নারীদের ধারণা না থাকায় তারা তাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

ভবিষ্যৎ করণীয় ও উত্তরণের উপায়

ঝিনাইদহের নারীদের স্বনির্ভরতার এই অগ্রযাত্রাকে আরও টেকসই ও অর্থবহ করতে হলে আমাদের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রথমত, এনজিওগুলোর ঋণের সুদের হার এমন একটি সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে, যাতে দরিদ্র নারীরা ঋণের বোঝা সইতে পারেন। কিস্তি আদায়ের ক্ষেত্রে মানবিক দিকগুলো বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নারীদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি শহরের ক্রেতাদের কাছে বা বড় বড় কোম্পানির কাছে বিক্রি করার জন্য এনজিওগুলোকেই একটি যোগসূত্র বা ‘সাপ্লাই চেইন’ তৈরি করে দিতে হবে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে গ্রামের নারীদের স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার শিখিয়ে ই-কমার্স বা ফেসবুক ভিত্তিক এফ-কমার্সের (F-commerce) সাথে যুক্ত করতে পারলে তারা নিজেরাই তাদের পণ্যের সঠিক দাম পাবেন।

তৃতীয়ত, শুধু নারীদের নিয়ে কাজ করলেই হবে না, পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মানসিকতা বদলানোর জন্য তাদের নিয়েও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। নারী ও পুরুষ একে অপরের প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক—এই বোধ সমাজের প্রতিটি স্তরে জাগ্রত করতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ঝিনাইদহ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একসময় যে নারীরা কেবল নিয়তির ওপর ভরসা করে জীবন পার করে দিতেন, তারা আজ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ছেন। এই অভাবনীয় জাগরণের পেছনে এনজিওগুলোর অবদান ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকার মতো। ক্ষুদ্রঋণ, প্রশিক্ষণ, আর সচেতনতার যে বীজ এনজিওগুলো এই মাটিতে বপন করেছিল, তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়ে সমাজের অন্ধকার দূর করছে।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল ঋণ দেওয়া এবং কিস্তি আদায় করাই যেন এনজিওগুলোর একমাত্র লক্ষ্য না হয়। তাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে নারীদের সত্যিকারের স্বনির্ভরতা ও মুক্তি অর্জন। ঋণের ফাঁদ থেকে বাঁচিয়ে, নারীদের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক বাজার নিশ্চিত করে এবং সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে যদি একটি সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা যায়, তবে ঝিনাইদহের এই নারীরা শুধু তাদের নিজেদের পরিবার নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও শক্তিশালী করে তুলবেন। এনজিও এবং সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারীদের এই অগ্রযাত্রা আগামী দিনে আরও মসৃণ ও সফল হবে—এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।


সম্পর্কিত নিবন্ধ