দুপুরের কড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরমে চারদিক বেশ গুমোট। ঘড়ির কাঁটায় বেলা তখন ঠিক দেড়টা। গ্রামে লোডশেডিং চলছিল, তাই ঘরে কোনো বিদ্যুৎ ছিল না। গরমের এই সময়ে গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকা খুব পরিচিত একটি দৃশ্য। আর এই বিদ্যুৎহীন সময়টিকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিল নোয়াখালীর ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর। বাড়ির বৈদ্যুতিক পানির মোটরে বেশ কিছুদিন ধরে সমস্যা হচ্ছিল। সে ভাবল, বিদ্যুৎ আসার আগেই নিজে নিজে মোটরের লাইনটি মেরামত করে ফেলবে। কিন্তু এই সাধারণ একটি কাজ যে তার জীবনের শেষ কাজ হতে যাচ্ছে, তা সে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। সে যখন নিবিষ্ট মনে মোটরের তার নিয়ে কাজ করছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ করে লাইনে বিদ্যুৎ চলে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুতের ভয়ংকর ঝটকায় সে তারের সাথে জড়িয়ে যায় এবং মাটিতে পড়ে তীব্রভাবে ছটফট করতে থাকে।
ছেলের এমন ভয়ানক ও মর্মান্তিক অবস্থা দেখে স্থির থাকতে পারেননি মা শেফালী আক্তার। সন্তানের বিপদে একজন মায়ের হৃদয় কীভাবে কেঁদে ওঠে, তিনি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দিলেন। নিজের জীবনের কোনো পরোয়া না করে তিনি সরাসরি ছেলেকে বাঁচাতে ছুটে যান। খালি হাতে ছেলেকে বিদ্যুতের মরণফাঁদ থেকে ছাড়িয়ে আনতে গেলে তিনিও বিদ্যুতায়িত হন। শক্তিশালী বিদ্যুতের ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যেই তিনি ছিটকে অনেক দূরে গিয়ে পড়েন। আজ বুধবার দুপুরে নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চরলক্ষ্মী গ্রামে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। চোখের সামনে মুহূর্তের ভুলে একটি তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে যাওয়ায় পুরো চরলক্ষ্মী গ্রামে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গ্রামের মানুষ এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
নিহত কিশোরের নাম ফয়সাল হোসেন। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র ছিল। তার বাবার নাম মো. ইয়াছিন ব্যাপারী। ফয়সালের স্বপ্ন ছিল ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করে সে পরিবারের হাল ধরবে। বন্ধুদের সাথে হাসি আনন্দে কাটানো ফয়সালের জীবনের সব স্বপ্ন আজ বিদ্যুতের তারে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। অন্যদিকে, ৪৩ বছর বয়সী মা শেফালী আক্তার এখন গুরুতর আহত অবস্থায় নোয়াখালী জেলা শহরের একটি বড় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। তার শরীরের বেশ কিছু অংশ বিদ্যুতের আগুনে পুড়ে গেছে। ছেলের শোকে পাগলপ্রায় এই মায়ের শারীরিক অবস্থাও এখন বেশ সংকটাপন্ন।
ফয়সালের মামা খলিলুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে পুরো ঘটনার বিবরণ দেন। তিনি জানান, ফয়সাল যখন বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে যায়, তখন তার মা শেফালী বেগম তাকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুতের জোর এত বেশি ছিল যে, তিনি ছেলেকে ছাড়াতে তো পারেনইনি, উল্টো নিজে মারাত্মকভাবে আহত হন। শেফালী বেগমের গগনবিদারী চিৎকার শুনে আশপাশের প্রতিবেশীরা নিজেদের কাজ ফেলে দ্রুত ছুটে আসেন। তারা এসে দেখেন মা ও ছেলে দুজনেই উঠানে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছেন। প্রতিবেশীরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত গাড়ি ডেকে দুজনকে উদ্ধার করে নোয়াখালী জেলা শহরের হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক ফয়সালকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন।
আমাদের দেশে গ্রামাঞ্চলে এমন বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সারা দেশে ঘটা মোট বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার প্রায় ৭৫% থেকে ৮০% ঘটে মূলত মানুষের অসচেতনতা এবং সঠিক নিরাপত্তার অভাবের কারণে। অনেকেই মেইন সুইচ পুরোপুরি বন্ধ না করেই সরাসরি বৈদ্যুতিক তারের কাজে হাত দেন। লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুৎ লাইনে কাজ করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ কর্তৃপক্ষ যেকোনো মুহূর্তে লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করতে পারে। এসব দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসার খরচও অনেক বেশি।
এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর পেয়ে চরজব্বার থানার পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। চরজব্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লুৎফর রহমান জানান, স্থানীয় মানুষের কাছে খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ সদস্যদের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সদস্যরা পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখছেন। তদন্ত শেষে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য সবাইকে জানাতে পারবে। ওসি আরও জানান, নিহত কিশোরের পরিবারের সদস্যরা যদি এই ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ করেন, তবে পুলিশ সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে প্রাথমিকভাবে পুলিশ এটিকে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখছে।
এই দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বিদ্যুতের কাজের ক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। সামান্য একটু ভুলের কারণে একটি সাজানো পরিবার কীভাবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, চরলক্ষ্মী গ্রামের এই পরিবারটি তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। কোনো ধরনের পূর্ব অভিজ্ঞতা বা সঠিক সরঞ্জাম ছাড়া বৈদ্যুতিক লাইনের কাজে হাত দেওয়া মোটেও উচিত নয়। সামান্য কিছু টাকা বাঁচাতে গিয়ে পেশাদার ইলেকট্রিশিয়ান না ডাকার ফল কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হতে পারে। দশম শ্রেণির এক হাসিখুশি কিশোরের এমন মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা যখন জ্ঞান ফিরে পাবেন এবং জানতে পারবেন যে তিনি তার আদরের সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি, তখন সেই মায়ের বুকের কষ্ট হয়তো পৃথিবীর কোনো ভাষাতেই প্রকাশ করা সম্ভব হবে না।
















