পেশোয়ার জালমি কেন তাঁকে এত আগ্রহ নিয়ে দলে ভিড়িয়েছিল, সেটির সবচেয়ে বড় প্রমাণ দিলেন বাংলাদেশের তরুণ ফাস্ট বোলার নাহিদ রানা। পাকিস্তানের লাহোরে আজ পাকিস্তান সুপার লিগের (পিএসএল) মেগা ফাইনালে গতির ঝড় তুলেছেন তিনি। তাঁর দুর্দান্ত বোলিংয়ে ভর করে হায়দরাবাদ কিংসকে মাত্র ১২৯ রানে অলআউট করে দেয় পেশোয়ার জালমি। এরপর ২৯ বল ও ৫ উইকেট হাতে রেখে সহজেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় তারা। আর এই জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ৯ বছর পর আবারও পিএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করল পেশোয়ার জালমি। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের এই মিলিয়ন $ (ডলার) আসরে বাংলাদেশের কোনো পেসারের এমন সাফল্য দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য অনেক বড় একটি সুসংবাদ।
ফাইনাল ম্যাচের মতো স্নায়ুচাপের লড়াইয়ে পেশোয়ার জালমির অধিনায়ক বাবর আজম নাহিদ রানার ওপর দারুণ আস্থা রাখেন। আগে ব্যাট করতে নামা হায়দরাবাদ কিংসের শুরুটা কিন্তু বেশ ভালোই ছিল। প্রথম ৫ ওভারে ২ উইকেট হারালেও তারা স্কোরবোর্ডে ৫৬ রান তুলে ফেলেছিল। ঠিক সেই সময়ে, অর্থাৎ ইনিংসের ষষ্ঠ ওভারে প্রথমবারের মতো বোলিংয়ে আসেন নাহিদ রানা। নিজের প্রথম ওভারে তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি। আগ্রাসী মেজাজে থাকা ব্যাটসম্যানরা তাঁর এই ওভার থেকে ১৩ রান তুলে নেন। তবে পরের ওভারে স্পিনার সুফিয়ান মুকিম মাত্র ৪ বলের ব্যবধানে উসমান খান ও ইরফান খানকে সাজঘরে ফেরালে হায়দরাবাদ বড় ধরনের চাপে পড়ে যায়।
দলের এই চাপের মুখে নাহিদ রানা নিজের দ্বিতীয় ওভারে বল করতে এসে প্রতিপক্ষকে একেবারে খাদের কিনারে ঠেলে দেন। এই ওভারের প্রথম বলেই তিনি বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান গ্লেন ম্যাক্সওয়েলকে গোল্ডেন ডাক উপহার দেন। রানার করা দারুণ এক শর্ট বলে বোকা বনে যান ম্যাক্সওয়েল। তিনি পুল করতে গিয়ে মিড অন অঞ্চলে সরাসরি ক্যাচ তুলে দেন। একই ওভারের পঞ্চম বলে কুশল পেরেরা রানআউটের ফাঁদে পড়লে হায়দরাবাদের স্কোর দাঁড়ায় ৬ উইকেটে ৭৩ রান। এই অত্যন্ত সফল ওভারে রানা মাত্র ৫ রান খরচ করেন।
নিজের তৃতীয় ওভারে বল করতে এসে নাহিদ রানা যেন আরও বেশি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। ইনিংসের ১৪তম ওভারে তিনি যখন বল হাতে নেন, হায়দরাবাদ ততক্ষণে ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে। এই ওভারে রানা তাঁর আগুনে গতির সামনে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের একটি রানও নেওয়ার সুযোগ দেননি। ওভারের পঞ্চম বলে হুনাইন শাহকে সরাসরি বোল্ড করে নিজের দ্বিতীয় উইকেটটি শিকার করেন তিনি। এটি ছিল একটি দুর্দান্ত মেইডেন উইকেট ওভার। এরপর ১৭তম ওভারে নিজের শেষ স্পেল করতে এসে তিনি মাত্র ৪ রান দেন। সব মিলিয়ে ফাইনালে ৪ ওভার বল করে মাত্র ২২ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন রানা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই ম্যাচে তিনি নিজের করা বলগুলোর প্রায় ৬০% ডট দিয়েছেন, যা টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে অসাধারণ এক কীর্তি।
১৩০ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পেশোয়ার জালমিও শুরুতে বেশ হোঁচট খায়। মাত্র ৪০ রান তুলতেই তারা ৪টি মূল্যবান উইকেট হারিয়ে বসে। ফাইনালের মঞ্চে এমন ব্যাটিং বিপর্যয়ে সমর্থকেরা যখন হারের শঙ্কায় ভুগছিলেন, ঠিক তখনই দলের হাল ধরেন অ্যারন হার্ডি ও আবদুল সামাদ। এই দুই ব্যাটসম্যান পঞ্চম উইকেটে ৮৫ রানের এক অবিচ্ছিন্ন ও ম্যাচজয়ী জুটি গড়েন। চাপের মুখে তাদের এই জুটি পেশোয়ারকে নতুন করে ম্যাচে ফিরিয়ে আনে।
সামাদ ৩৪ বলে ৪৮ রান করে আউট হয়ে গেলেও অ্যারন হার্ডি দলকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়েন। তিনি ৩৯ বলে ৫৬ রান করে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন। ব্যাটিংয়ে নামার আগে বল হাতেও হার্ডি দারুণ সফল ছিলেন। এই পেস বোলিং অলরাউন্ডার মাত্র ২৭ রান দিয়ে ৪টি উইকেট তুলে নেন। তবে ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশের নাহিদ রানার এমন সাহসী পারফরম্যান্স সবার নজর কেড়েছে। বিদেশের মাটিতে চাপ সামলে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে এমন নিখুঁত বোলিং করাটা রানার ক্যারিয়ারের জন্য এক বিশাল মাইলফলক হয়ে থাকবে। দেশের পেস বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ যে সঠিক হাতেই আছে, রানা আজ তা আবারও প্রমাণ করলেন।
















