সুস্বাস্থ্য মানুষের অন্যতম প্রধান মৌলিক অধিকার। একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতিই পারে সমাজ ও দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় এক বিশাল ও অমানবিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে। একসময় চিকিৎসা সেবাকে পরম ধর্ম ও মানবিক কাজ বলে মনে করা হতো, কিন্তু আজ তা অনেকাংশেই পরিণত হয়েছে একটি অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসায়। বর্তমান সময়ে যার পকেটে টাকা আছে, তিনি পাচ্ছেন উন্নত ও দ্রুত চিকিৎসা। আর যার টাকা নেই, তাকে সরকারি হাসপাতালের মেঝেতে বা বারান্দায় শুয়ে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এবং কোভিড-পরবর্তী সময়ে গরিব ও ধনীর মাঝে স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির এই আকাশপাতাল পার্থক্য আরও প্রকট হয়ে উঠেছে, যা আজ আমাদের সমাজের এক রূঢ় বাস্তবতা। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কেন দিন দিন স্বাস্থ্যসেবায় এই বৈষম্য এত চরম আকার ধারণ করছে এবং এর পেছনের কারণগুলো কী।
সরকারি ও বেসরকারি সেবার আকাশপাতাল পার্থক্য
আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যের সবচেয়ে বড় কারণ হলো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যকার বিশাল পার্থক্য। সরকারি হাসপাতালগুলোতে সবসময় রোগীর উপচে পড়া ভিড় থাকে। শয্যার তীব্র অভাব, অপরিষ্কার পরিবেশ, বাথরুমের দুর্দশা এবং পর্যাপ্ত ওষুধের ঘাটতি সেখানে নিত্যদিনের চিত্র। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো যেন পাঁচতারা হোটেলের মতো গড়ে উঠেছে। সেখানে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক কক্ষ, দামি যন্ত্রপাতি এবং দ্রুত সেবার ব্যবস্থা। কিন্তু তাদের চিকিৎসা ব্যয় এতই বেশি যে, একজন সাধারণ বা নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে সেখানে পা রাখাও সম্ভব নয়। ফলে ধনীরা সহজেই টাকার বিনিময়ে উন্নত সেবা কিনে নিচ্ছেন, আর গরিবরা সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার মাঝে আটকা পড়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।
শহরের উন্নত সেবা বনাম গ্রামের অবহেলিত চিত্র
স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্যের আরেকটি বড় রূপ হলো শহর এবং গ্রামের মধ্যকার ভৌগোলিক পার্থক্য। দেশের প্রায় সব নামিদামি হাসপাতাল, আধুনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং বড় বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাজধানী ঢাকা বা বড় বিভাগীয় শহরগুলোতে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে, গ্রামের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে অনেক সময় সাধারণ প্যারাসিটামল বা স্যালাইন ছাড়া আর কোনো ওষুধ পাওয়া যায় না। এক্স-রে বা আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও তা চালানোর টেকনিশিয়ান না থাকায় সেগুলো নষ্ট পড়ে থাকে। ফলে গ্রামের কোনো মুমূর্ষু রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়ে সেই শহরেই ছুটতে হয়। যাতায়াতের এই দীর্ঘ সময়ে অনেক রোগীর পথেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। শহরের মানুষের জন্য চিকিৎসা যতটা হাতের মুঠোয়, গ্রামের মানুষের জন্য তা ততটাই সোনার হরিণ।
চিকিৎসার মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি
বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে চিকিৎসার খরচ। ডাক্তারদের ভিজিট, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের দাম এবং নানা ধরনের প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার খরচ আজ সাধারণ মানুষের নাগালের পুরোপুরি বাইরে চলে গেছে। অনেক প্রাইভেট হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করালে প্রতিদিনের আইসিইউ (ICU) বা বেড ভাড়া মেটাতে গিয়ে রোগীর পরিবারকে ঘটিবাটি, এমনকি শেষ সম্বল আবাদি জমিও বিক্রি করতে হয়। চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতি বছর আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র সীমার নিচে চলে যাচ্ছে। টাকার অভাবে মাঝপথে মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা বন্ধ করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের চারপাশে এখন অহরহ ঘটছে।
চিকিৎসক ও জনবল সংকটের প্রভাব
সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক এবং নার্সের সংখ্যা একেবারেই অপ্রতুল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে নির্দিষ্ট সংখ্যক রোগী থাকার কথা, কিন্তু আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন বহির্বিভাগে শত শত রোগী দেখতে হয়। ফলে একজন ডাক্তার চাইলেও একজন রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে তার সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারেন না। মাত্র এক-দুই মিনিটের মধ্যেই তাকে প্রেসক্রিপশন লিখে বিদায় করতে হয়। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকরা রোগীদের বেশ সময় দেন। এই জনবল সংকটের কারণে সরকারি হাসপাতালে সেবার মান কমছে এবং সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়ে আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
দালাল চক্র ও অব্যবস্থাপনার দৌরাত্ম্য
সরকারি হাসপাতালগুলোর আশেপাশে সবসময় একটি শক্তিশালী দালাল চক্র সক্রিয় থাকে, যা স্বাস্থ্য বৈষম্যকে আরও উসকে দিচ্ছে। গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল ও অসহায় রোগীদের ভুল বুঝিয়ে এই দালালরা নিজেদের পরিচিত নিচু মানের প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে রোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। শুধু বাইরে নয়, হাসপাতালের ভেতরেও ওয়ার্ড বয় বা আয়াদের বকশিশের নামে টাকা না দিলে অনেক সময় ট্রলি বা হুইলচেয়ার সেবা পাওয়া যায় না। এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দরিদ্র রোগীরা সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং সরকারি চিকিৎসাও তাদের জন্য সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে জুটছে না।
স্বাস্থ্য বিমার অভাব ও পকেট থেকে খরচ
উন্নত বিশ্বে নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বিমা বা হেলথ ইন্স্যুরেন্স একটি বড় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমার কোনো কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। ফলে চিকিৎসার পুরো খরচটাই রোগীর পরিবারকে নিজেদের পকেট থেকে (Out-of-pocket expenditure) মেটাতে হয়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমাদের দেশে চিকিৎসার খরচের প্রায় ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে নগদ দিতে হয়। যার জমানো টাকা আছে, সে বেঁচে যাচ্ছে; আর যার নেই, সে নিয়তির ওপর ভরসা করে মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছে। এই অবস্থাই সমাজে স্বাস্থ্য খাতের বৈষম্যকে সবচেয়ে বেশি পাকাপোক্ত করছে।
বৈষম্য দূরীকরণে করণীয়
এই অমানবিক বৈষম্য দূর করতে হলে সবার আগে সরকারকে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অনুপাতে বাজেট বাড়াতে হবে। শুধু বড় শহর নয়, গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। চিকিৎসকদের গ্রামে থাকার জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও নিরাপত্তা দেওয়া যেতে পারে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর লাগামহীন ফি ও টেস্টের দাম সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট করে দিতে হবে এবং তা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, দেশের সকল নাগরিকের জন্য একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালু করা, যাতে টাকার অভাবে কাউকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে মরতে না হয়। দালাল চক্র নির্মূলে প্রশাসনকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
উপসংহার
চিকিৎসা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্মগত অধিকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবায় যে ভয়াবহ ও অমানবিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই একটি স্বাধীন ও মানবিক দেশের জন্য কাম্য হতে পারে না। এই অবস্থা চলতে থাকলে ধনী ও গরিবের মাঝে সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষোভ আরও তীব্র হবে। স্বাস্থ্যসেবাকে নিছক ব্যবসার হাতিয়ার না বানিয়ে, এটিকে সেবামূলক মানসিকতায় ফিরিয়ে আনতে হবে। সরকার, চিকিৎসক সমাজ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় এমন একটি উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পকেটের টাকা নয়, বরং মানুষের জীবনই হবে সবচেয়ে মূল্যবান। তবেই আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সবল ও বৈষম্যহীন সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষ
















