ট্রাম্পের খেয়ালখুশি ও আইনের প্রতি অবজ্ঞা: যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন একনায়কতন্ত্রের শঙ্কা

LinkedIn
Twitter
Facebook
Telegram
WhatsApp
Email
Donald-Trump

মাস দুয়েক আগে প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস–এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় একটি কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, প্রচলিত আইনের তিনি কোনো ধার ধারেন না; তিনি তা–ই করবেন, যা তার নিজের মন চাইবে। তার সেই দম্ভভরা কথাটি ছিল, “আমার কাজের একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো আমার নিজের নৈতিকতা, আমার নিজের মন।”

ট্রাম্প কিন্তু শুধু কথার কথা বলেননি, তিনি অক্ষরে অক্ষরে নিজের কথা রেখে চলেছেন। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি আমেরিকার প্রচলিত সব নিয়মনীতি ভেঙে একের পর এক এমন সব অভিনব ও অদ্ভুত কাজ করছেন, যার ধাক্কা পোহাতে শুধু আমেরিকার সাধারণ মানুষকে নয়, বরং সারা বিশ্বের রাজনীতি ও অর্থনীতিকেই হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জর্জ ওয়াশিংটন বা আব্রাহাম লিংকনের মতো নেতারা স্মরণীয় হয়েছেন দেশকে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে এবং জয়ী হয়ে। ট্রাম্প মনে করেন, তিনি কোনো অংশেই তাদের চেয়ে কম নন। তাই নিজের নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখার জন্য তিনি একটির পর একটি যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছেন। গত মেয়াদে তিনি জোর খাটিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু তীব্র প্রতিবাদের মুখে তাতে সফল হননি। তবে সুযোগের তো অভাব নেই। ফলে তিনি ভেনেজুয়েলা ও ইরানের মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সামনে হয়তো কিউবার পালা আসতে পারে।

যুদ্ধ করার জন্য শুধু সৈন্য হলে তো চলবে না, তার চাই আধুনিক সব অস্ত্রশস্ত্র। আমেরিকার বিখ্যাত নেতাদের নামে রণতরি রয়েছে, তো ট্রাম্পের নামে কেন থাকবে না? তিনি শুধু একটি রণতরির কথা বলেননি, বরং পুরো একটি নতুন জাতের রণতরি বহর নির্মাণের বিশাল ও উচ্চাভিলাষী ঘোষণা দিয়েছেন। এই নতুন বহরের নাম হবে ‘ট্রাম্প ক্লাস অব ওয়ারশিপস’। এরপর তিনি ঠিক করেছেন, হোয়াইট হাউসের চত্বরে বিশাল এক বলরুম বানাবেন, যা এতটাই বিরাট হবে যে তা খোদ হোয়াইট হাউসের চেয়েও বড় মনে হবে। তবে দেশের আদালত তাকে জানিয়েছেন, এই কাজটা কোনোভাবেই আইনসংগত হয়নি।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by hardwareanalytic.com.

ক্ষমতার অপব্যবহারের উদাহরণ এখানেই শেষ নয়। এরই মধ্যে ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান, সড়ক বা ভবনের নাম বদলে নিজের নামে করেছেন ট্রাম্প। বিখ্যাত কেনেডি সেন্টারের নাম বদলে রাখা হয়েছে কেনেডি-ট্রাম্প সেন্টার। ফ্লোরিডার পাম বিচ এয়ারপোর্টের নতুন নাম হয়েছে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। একই শহরের বিখ্যাত পাম বুলেভার্ডের নতুন নাম রাখা হয়েছে ট্রাম্প বুলেভার্ড। শুধু তাই নয়, অতিধনীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যে নতুন গ্রিন কার্ড চালু হয়েছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রাম্প গোল্ড কার্ড’। এছাড়া ডলারে নিজের স্বাক্ষর যুক্ত করার সিদ্ধান্ত এবং নিজের ছবিসংবলিত পাসপোর্ট বানানোর ঘোষণাও তিনি দিয়েছেন।

তবে চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প যা করেছেন, তা বোধ হয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচারে এসব উদাহরণকেও ছাড়িয়ে গেছে। তিনি ঠিক করেছেন, নিজেই নিজের সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করবেন! এক-দুই ডলার নয়, একেবারে ১০ বিলিয়ন ($১০,০০০,০০০,০০০) ডলারের বিশাল ক্ষতিপূরণ চেয়ে তিনি এই মামলা ঠুকেছেন। তার অভিযোগ, ২০১৯ সালে দেশের রাজস্ব বিভাগ (IRS) নিয়মভঙ্গ করে তার নিজের কর প্রদানের গোপন হিসাব সংবাদমাধ্যমে ফাঁস করে দেয়। এতে তার যে মানহানি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি এই বিপুল অর্থ দাবি করছেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিজের সরকারের বিরুদ্ধে যে মামলা তিনি ঠুকেছেন, তা লড়তে হবে তারই নিয়োগকৃত অ্যাটর্নি জেনারেলকে। এখন বিচার বিভাগ কি বিবাদী ট্রাম্পের পক্ষে মামলা চালাবে, না বাদী হয়ে জনস্বার্থে তার বিরুদ্ধে মামলা করবে, তা নিয়ে এক অদ্ভুত আইনি সংকট তৈরি হয়েছে।

এদিকে ট্রাম্পের এই মামলার ঠিক এক দিন পর সেই বিচার বিভাগ দেশের সাবেক এফবিআই প্রধান জেমস কোমির বিরুদ্ধে এক অদ্ভুত মামলা ঠুকেছে। অভিযোগ, কোমি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন, যেখানে সমুদ্রসৈকতে ঝিনুকের ওপর ‘৮৬৪৭’ নম্বর লেখা ছিল। চলতি পরিভাষায় ‘৮৬’ মানে কাউকে ছেঁটে ফেলা বা খুন করা। আর ‘৪৭’ মানে ট্রাম্প, কারণ তিনি আমেরিকার ৪৭ নম্বর প্রেসিডেন্ট। এই দুইয়ে দুই মিলিয়ে বিচার বিভাগ ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে কোমির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছে।

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

এই মামলার বিবরণ পড়ে আইনজ্ঞ ও পণ্ডিতকুল রীতিমতো হেসে আকুল। এক বছর আগের পোস্ট, যা প্রকাশের এক দিন পরেই কোমি মুছে ফেলেন, তা নিয়ে এখন কেন মামলা? তিনি যদি ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করেই থাকেন, তাহলে সে ব্যাপারে বিচার বিভাগের টনক এত দিন পরে কেন নড়ল? এর পেছনে আসল কারণ হলো কোমির সঙ্গে ট্রাম্পের পুরোনো শত্রুতা। ২০১৬ সালের নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপ নিয়ে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন কোমি। ট্রাম্পের রাগ সেখানেই। অযোগ্যতার মিথ্যা অভিযোগে তিনি কোমিকে ২০১৭ সালে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। এবার ইন্টারনেট হাতড়ে এক মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে কোমিকে ফাঁসানোর চেষ্টা চলছে।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর মতো পত্রিকা প্রথম পাতায় কড়া প্রশ্ন তুলেছে, লোকটা কি আসলেই পাগল হয়ে গেছেন? সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল বিচারকেরা তার খামখেয়ালিপনাকে দিনের পর দিন প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা তাকে এবং তার অতি অনুগত সমর্থকদের এতটাই ভয় পান যে কেউ তার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটিও করতে নারাজ। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগ সমান অধিকার ভোগ করে। কিন্তু এখন সেই নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ট্রাম্প এখন এতটাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছেন যে অনেকেই তাকে রাজা নামে ডাকা শুরু করেছেন।

রক্ষণশীল রিপাবলিকানরা যে ‘একক নির্বাহী তত্ত্ব’ বা ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ থিওরি খাড়া করেছেন, তাতে দেশের সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হলেন প্রেসিডেন্ট। সমস্যা হলো, এই তত্ত্ব মেনে নিলে একজন প্রেসিডেন্ট ও একজন স্বৈরাচারী রাজার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। প্রেসিডেন্ট যখন সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠেন, তখন তার ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না। ট্রাম্পের বেলাতেও ঠিক সেই ঘটনাই ঘটছে। বিশ্বের অনেক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রনায়কই অমরত্বের সন্ধানে দেশজুড়ে নিজের নাম ও ভাস্কর্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখেছেন। ট্রাম্পও এখন সেই পথেই হাঁটছেন। এখন শুধু দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন ডিসির নাম বদলে তিনি কবে ‘ট্রাম্প সিটি’ রাখেন!

ADVERTISEMENT
3rd party Ad. Not an offer or recommendation by dailyalo.com.

সম্পর্কিত নিবন্ধ