দেশে বর্তমানে অনলাইন সাংবাদিকতা সাধারণ মানুষের খবর পাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু সম্প্রতি অনলাইন নিউজ পোর্টালের ডোমেইন অপসারণ বা ব্লক করার বিষয়ে পুলিশ হঠাৎ করেই একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। পুলিশের এমন সিদ্ধান্তে দেশের সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকরা পুলিশের এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর একটি নগ্ন আঘাত হিসেবে দেখছেন। তারা মনে করেন, ডোমেইন বন্ধ করার এই ধরনের কাজ কোনোভাবেই পুলিশের সাধারণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
নিউজ পোর্টাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনের সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক লায়ন হাকিকুল ইসলাম খোকন এবং সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান আরিফ গণমাধ্যমে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। তারা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, কোনো নিউজ পোর্টালের ডোমেইন বাতিল বা ব্লক করার আইনি অধিকার পুলিশের নেই। এই দায়িত্ব পুরোপুরি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হাতে ন্যস্ত। পুলিশ কেন নিজেদের আইনি সীমানার বাইরে গিয়ে এমন কাজ করছে, তা নিয়ে তারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
আমাদের দেশে এখন কয়েক হাজার ছোট-বড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল কাজ করছে। এসব পোর্টালের নিবন্ধন, অনুমোদন, তদারকি এবং প্রয়োজনে ডোমেইন ব্যবস্থাপনার কাজ দেখার একমাত্র বৈধ আইনি কর্তৃপক্ষ হলো তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। সাংবাদিক নেতারা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, পুলিশকে, বিশেষ করে সিলেটের পুলিশ কমিশনারকে এমন কোনো বাড়তি ক্ষমতা সরকার দিয়েছে কি না। যদি এমন কোনো নির্দেশনা আসলেই দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা দেশের বর্তমান সংবিধানের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার মৌলিক অধিকারের একেবারে পরিপন্থী।
সিলেট অঞ্চলের স্থানীয় সাংবাদিকরাও পুলিশের এমন বিজ্ঞপ্তির পর চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন। তারা মাঠে গিয়ে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে ভয় পাচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মতে, কোনো দেশে যদি সাংবাদিকদের ওপর এমন পুলিশি খড়্গ নেমে আসে, তবে সেই দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক অন্তত ২০% থেকে ৩০% নিচে নেমে যায়। একটি নিউজ পোর্টাল চালাতে গিয়ে মালিকদের সার্ভার ভাড়া, ডোমেইন কেনা ও কর্মীদের বেতন বাবদ প্রতি মাসে হাজার হাজার ডলার ($) খরচ করতে হয়। হঠাৎ করে কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়া ডোমেইন ব্লক করে দিলে এই বিশাল বিনিয়োগ পুরোপুরি হুমকিতে পড়ে যায়।
বিভিন্ন জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% মানুষ এখন প্রতিদিনের তাজা খবরের জন্য অনলাইন পোর্টালগুলোর ওপর নির্ভর করেন। এমন অবস্থায় পুলিশের এই ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ শুধু পেশাদারিত্বের সীমাই লঙ্ঘন করে না, বরং এটি পুরো গণমাধ্যম খাতের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর মারাত্মক এক আঘাত। সাংবাদিক নেতারা বলেন, পুলিশের এমন ভয়ভীতি দেখানোর কারণে সংবাদকর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। এর ফলে সাংবাদিকদের মধ্যে সেলফ-সেন্সরশিপ বা স্বেচ্ছায় খবর চেপে যাওয়ার প্রবণতা অন্তত ৪০% থেকে ৫০% বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। মানুষ যখন ভয় পায়, তখন তারা সত্য লিখতে সাহস করে না।
একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এই পরিস্থিতি একটি ভয়াবহ অশনিসংকেত। পুলিশ দিয়ে জোর করে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা যেকোনো দেশের গণতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। নিউজ পোর্টাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন, তারা যেকোনো মূল্যে স্বাধীন সাংবাদিকতার পক্ষে অবিচল থাকবেন। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার এমন যেকোনো অন্যায় ও বেআইনি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা শুধু বিবৃতি দিয়েই থেমে থাকবেন না।
তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে তারা দেশের সব সাধারণ সাংবাদিককে সাথে নিয়ে রাজপথে নামবেন। একই সাথে তারা এই ধরনের অগণতান্ত্রিক ও বেআইনি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কঠোর আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান পাহারাদার। তাই সরকারের উচিত দ্রুত এই বিষয়টি পরিষ্কার করা। তথ্য মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসির মাধ্যমেই অনলাইন পোর্টালগুলোর সুষ্ঠু নীতিমালা নিশ্চিত করা দরকার, পুলিশের ভয়ের মাধ্যমে নয়।
















